ড্যানিয়েল লেভিটিনঃ মডার্ন জগৎ আপনার মস্তিষ্কের জন্যে খারাপ, কেনো- ১ম কিস্তি

 

[ফেইসবুক টুইটার টেক্সট-মেসেজ এবং ইমেইলের এই গহীন গাঢ় সময়ে আমাদের সবাইকেই একইসাথে অনেকগুলো কাজ (মাল্টিটাস্কিং) করবার আবশ্যকতা দেখা দিয়েছে, সত্য। কিন্তু এই সার্বক্ষণিক মাল্টিটাস্কিং এক ধরনের নীরব নিশ্চুপ ক্ষয়সাধন করে যাচ্ছে নিয়তই। আমেরিকান ড্যানিয়েল লেভিটিন, ক্যানাডার ক্যুবেক মন্ট্রিয়েলে বিশ্ববিদ্যালয় ম্যাকগিল ইউনিভার্সিটিতে মনোবিজ্ঞান ও বিহেভিয়েরাল নিউরোসায়েন্স (আচরণগত স্নায়ুবিজ্ঞান) পড়াচ্ছেন বহুদিন। অধ্যাপনার সাথে সাথে উনি মিউজিক থিউরি  নিয়েও গবেষণা করেন এবং নিজেও সুপরিচিত মিউজিশিয়ান । বৃটেনের খ্যাতিমান লিবেরাল দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকাটিতে বিগত আঠেরো জানুয়ারীতে লেখা এক আর্টিকেলে তিনি ব্যাখ্যা করেছেন, বর্তমানকালের প্রযুক্তিজনিত আসক্তি কী ক’রে আমাদের আরো অদক্ষ ক’রে তুলছে।]

aaeace76-cd7c-4ea3-b300-98fd6c11768b-2060x1488
ডেনিয়েল জে. লেভিটিনঃ ‘যখন একটা কাজে মনোযোগী হচ্ছেন, তখন ইনবক্সের একটি আনরেড ইমেইল, আপনার আইকিউ দশ পয়েন্ট কমিয়ে ফেলছে।’

ব্যস্ত। আমরা এখন দুরন্ত ব্যস্ত। আমাদের মস্তিষ্কও তেমনই পাল্লা দিয়ে দুরন্ততর ব্যস্ত। এরইমধ্যে প্রতিনিয়তই আমরা আক্রান্ত হচ্ছি আসল প্রমাণ, নকল প্রমাণ, ফাউল-টক্‌ এবং গুজবের বন্যায়। এসবটাই তেড়েফুড়ে আসছে তথ্যের চেহারা নিয়ে। এর মধ্যে কোনগুলো আমদের সত্যিই জানা দরকার এবং কোনগুলো সত্যিই এড়িয়ে যাওয়া দরকার, তা ভাবতে ভাবতেই আমরা সকলেই কম্বল-ক্লান্ত। একই সাথে সাধ্যের সমস্ত সীমা অতিক্রম করে যাচ্ছি আমরা সকলেই। তুলনা করলে আজ থেকে ত্রিশ বছর আগেও বিমান ও রেলের টিকেট যোগাড় করতো যে ট্রাভেল-এজেন্টরা, দোকানে কোনো দরকারী টুকিটাকি খুঁজে নিতে সহায়তা করতো যে সেল্‌স্‌পিপলরা, এবং আমাদের করেস্পন্ডেন্সগুলো বা বার্তাযোগাযোগ গুছিয়ে রাখতো যে প্রোফেশনাল টাইপিস্টরা বা অফিস সেক্রেটারিরা। বর্তমানে সেই সমস্ত কাজই আমরা নিজেরাই করছি। একইসাথে ভিন্ন ভিন্ন দশজনের কাজ করে যাচ্ছি এবং সেইসাথে দৈনন্দিন সাংসারিক কর্তব্য, বন্ধুবান্ধবের আড্ডা, ক্যারিয়ার, নানান হেঁয়ালি শখ, এমন-কী প্রিয় টিভি শো-সহ অন্যান্য কাজেও সমান তাল দিচ্ছি।

আমাদের স্মার্টফোনগুলো স্মার্ট তো বটেই এমন-কী মার্কেটে কিনতে পাওয়া যায় যে সুইসআর্মি ছোরাগুলোর মতোন যেন। যেগুলোয় একইসাথে থাকছে অভিধান, ক্যালকুলেটর, ওয়েব-ব্রাউজার, ইমেইল, গেইম বয়, ভয়েস রেকর্ডার, গিটার টিউনার, আবহাওয়া পূর্বাভাস, জিপিএস, টেক্সটার, টুইটার, ফেইসবুক আপডেটার, এবং একটি টর্চবাতি। আসলেই স্মার্ট। তো স্মার্টফোনগুলো ত্রিশ বছর আগের আইবিএম কোম্পানির কর্পোরেট হেডকোয়ার্টারে ব্যবহৃত হতো সবচে আধুনিক যে কম্পিউটারগুলো, সেগুলোর চেয়েও এখন বেশী উন্নত ও শক্তিশালী। তবে মজার কথা হলো অবলীলায় অনায়াসে আমরা প্রতিনিয়ত তা ব্যবহার করে যাচ্ছি। এ-যেন ২১ শতাব্দীর নতুন এক ম্যানিয়া। অবসরের ফাঁকেফোঁকড়ে সমস্ত মানবীয় বিষয়াবলী গাদাগাদি করে রাখার চেষ্টা। আমরা হাঁটার সময় করে চলছি টেক্সটিং। টিকেটের দীর্ঘলাইনে দাঁড়িয়ে দেখে নিচ্ছি ইমেইল। আর যখন বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে লাঞ্চ করছি, লুকিয়ে ফেইসবুকে দেখে নিচ্ছি অন্য বন্ধুরা কে কোথায় কী করছে। রান্নাঘরের আরামদায়ক কোণে বসে আমরা করে চলেছি নিত্যদিনের বাজারসদাইয়ের লিস্ট যখন পডকাস্টে আবার আরবান মৌচাষাবাদের উপর তথ্যবহুল অনুষ্ঠানও চলছে।

বাংলা প্রবাদ আছে, অধিক সন্ন্যাসে গাঁজন নষ্ট। মাল্টিটাস্কিং, অর্থাৎ একইসাথে অনেকগুলো কাজ করা, যদিও আমরা ভাবছি এটা খুব সহজ কিন্তু এই ভাবনাটা দানবিক শক্তিশালী একপ্রকার বিভ্রম। আর্ল মিলার, ম্যাসাচুসেটস্‌ ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজির একজন নিউরোসায়েন্টিস্ট (স্নায়ুবিজ্ঞানী) এবং ডিভাইডেড এটেনশান (দ্বিধাবিভক্ত মনোযোগ) বিষয়ের উপর বিশেষজ্ঞ বলেন যে, আমাদের মস্তিষ্কগুলো ”ভালোভাবে মাল্টিটাস্কিং-এর জন্য গঠিত নয়… যখন পাব্লিক ভাবছে যে মাল্টিটাস্কিং করছে, তারা আসলে একটা টাস্ক থেকে আরেকটা টাস্কে খুব দ্রুত মনোযোগ বদলে নিচ্ছে। সাথে সাথে প্রতিবার তারা যখন এমনটা করছে, তখন একপ্রকার মানসিক দাম মেটাতে হচ্ছে।” মানে দাঁড়াচ্ছে যে একজন অভিজ্ঞ জাগলারের মতোন ক’রে আমরা অনেকগুলো বল নিয়ে ব্যালেন্সের খেলাটা খেলছি, ঘটনাটা কিন্তু তেমন না। ঘটনাটা অনেকটাই পা-নেই-একজন এম্পুটি ইনজুরি নিয়ে মাত্রাতিরিক্ত কাজ করছে তেমনটাই। যেটা কিনা আদতে ইনজুরির ক্ষয়-ত্রুটিকে দেখতে দিচ্ছে না এবং পরিশেষে ভেঙ্গে পড়ে যেতেই বাধ্য করবে। কেননা, আমরা ভাবছি আমরা অনেক কাজ এগিয়ে নিচ্ছি। তবে বিদ্রুপকর শোনালেও, উদঘাটিত সত্যটা হলো যে মাল্টিটাস্কিং আসলেই আমাদের আরো অদক্ষ করে তুলছে।

দেখা গেছে যে মাল্টিটাস্কিং দেহে স্ট্রেস-হরমোন করটিসলের(১) মাত্রাবৃদ্ধিতে প্রভাব রাখছে। আরো দেখা গেছে যে এড্রেনালিন(২) হরমোনকেও বাড়িয়ে দিচ্ছে। এগুলো মনুষ্য মস্তিষ্ককে অতি উত্তেজিত ক’রে ঘোলাটে অগোছালো চিন্তা বাড়িয়ে দিচ্ছে। মাল্টিটাস্কিং দেহের ভিতর আরো তৈরী করছে ডোপামাইন(৩)-ক্যামিকেল-এডিকশন-ফীডব্যাক-লুপ। এতে করে মস্তিষ্ক কার্যত অনুধ্যানের দক্ষতা হারিয়ে বসছে এবং নেশাগ্রস্থের মতোন সর্বদা সন্ধান করছে বহির্জগত হতে নতুন নতুন স্টিমুলেশান বা প্রণোদনা। অবস্থা আরো শোচনীয় করছে মস্তিষ্কের পৃ ফ্রন্টাল কর্টেক্স। যেটার রয়েছে নভেল্টি-বায়াস অর্থাৎ জাগতিক নতুনত্বর প্রতি সদা কৌতুহলী হওয়ার সহজাত গুণ। সহজেই নতুনত্বর মূলা দেখিয়ে এটার মনোযোগ হাইজ্যাক করে নেয়া যায়। যেমনটা প্রায়শই চকচকে অবজেক্ট নেড়েচেড়ে মনুষ্য-শিশুদের কুকুর-ছানাদের ও বিড়াল-শাবকদের প্রলুব্ধ করতে দেখা যায়। তো নানাবিধ দরকারী কাজে যখন আমরা পরিপূর্ণ মনোনিবেশ করছি বা করতে চাইছি, রঙ্গ-নাটকটা ঠিক তখনই আরো জমাট বাঁধে। মস্তিষ্কের যে অঞ্চলটার উপর মনোযোগের জন্যে আমরা সম্পূর্ণ নির্ভরশীল ঠিক সেটাই, কোনো গলদ বাদ দিয়েই তখন, পরিপূর্ণমাত্রায় বিভ্রান্তি আক্রান্ত হচ্ছে। আমরা টেলিফোন আন্সার করছি, ইন্টেরনেটে কোনো টপিক দেখার চেষ্টা করছি, ইমেইল চেক্‌ করছি, এসএমএস-টেক্সট পাঠাচ্ছি। এই প্রতিটা বিষয়ই আমাদের মস্তিষ্কের নভেল্টি-বায়াস-সেন্টার বা রিওয়ার্ড-সীকিং-সেন্টারগুলোতে অতিমাত্রায় এন্ডোজেনাস অপিওয়েডস বা দেহাভ্যন্তরীণ ব্যথানাশক– একপ্রকার ভালোলাগা ঘোর তৈরী করে– এগুলো ক্ষরণে ভূমিকা রাখছে। (আশ্চর্য কী যে অকাজ ভালোই তো লাগছে!) আর এ-সমস্তই যেকোনো কাজে নিবিষ্ট থাকতে চাওয়ার প্রবণতাকে ক্ষতিগ্রস্থ করে চলেছে। বলা যায় যে এই অকাজ মস্তিষ্কের জন্যে এক আল্টিমেইট শুন্য ক্যালরিযুক্ত লজেন্স। খেলেও ওজন তো আর বাড়ছে না, ভয় কী! তফাৎ হচ্ছে পূর্ণ মনোনিবিষ্ট ও ধারাবাহিক কর্মদক্ষতায় যেকোনো একটা কাজ সম্পন্ন ক’রে নিয়ে যে স্যাটিসফ্যাকশান, যেমন পুষ্টিকর খাবার আস্বাদন করার পর তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলতে পারি আমরা, সেটা আদতে এইরকম ছোটখাটো খুঁচখাঁচ একটাকা-দুইটাকা দামের হাজারখানেক লজেন্সরূপী কাজ পেটের বদলে মাথায় চালান ক’রে নিরম্বু পুষ্টির আস্বাদ নিচ্ছি। (চলবে)

টীকাটিপ্পনী বা অনুবাদকের ফাতরা আলাপ-

(১) করটিসল– দেহাভ্যন্তরীণ এড্রেনালিন গ্রন্থির ভিতর একপ্রকার বিশেষ স্টেরয়েড হরমোন বা প্রাণরস। যেটা স্ট্রেস কমায় ও রক্তে শর্করা-পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। এছাড়া চর্বি আমিষ ইত্যাদি বিপাকে সহায়ক।

(২) এড্রেনালিন–  দেহাভ্যন্তরীণ এড্রেনালিন গ্রন্থির মেডুলার ভিতর একপ্রকার বিশেষ হরমোন বা প্রাণরস এবং নিউরোট্রান্সমিটার। বিপাক-প্রক্রিয়া ফুসফুসের নালিকা-প্রসারণ ও স্নায়ুবিক কাজে বিশেষ ভূমিকা রাখে।

(৩) ডোপামাইন– মস্তিষ্কের একপ্রকার বিশেষ হরমোন বা প্রাণরস এবং নিউরোট্রান্সমিটার। স্নায়ুবিক কাজ ক্যামিকেল মেসেঞ্জার-সহ আরো বহুবিধ জটিল কাজে বিশেষ ভূমিকা রাখে।

অনুবাদ- অনিক সিংহ

One comment

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s