স্মৃতিচারণ ১৯৯৫-৯৬ (এক) – আল-বিরুনী প্রমিথ

[ লেখক স্মৃতিচারণ করছেন। তায় আবার এক্কেবারে তারিখ শুদ্ধা, যেনবা ডায়রি লিখছেন। তার এই অবিশ্বাস্য মনে রাখার খ্যামতা কি কেবল ব্রেনের কৃতিত্ব? আমগো মনে হয় না। হৃদয়েরও কি ক্রেডিট নাই? সে সময়গুলার প্রতি ভালবাসা, টানই তারে মনে রাখায় হয়তো। তিনি ভুলেন না। আহেন। আয়া পড়েন। টাইম মেশিনে কইরা যাইগা, ৯৫, ৯৬-এ। সে অনেক কাল আগের কথা। ডায়নোসর ছিল না। তয় লারা, কাম্বলি, রানাতুঙ্গা, এমব্রোস, গুরুসিঙ্ঘা, ডি সিলভারা আছিলেন। আমাগো কারো কারো ধারে তারাই ছিলেন মেনেলাউস, হেক্টর, আয়াক্স, আগামেমনন, অদিসিউস, কর্ণ, ভীম, রুস্তম। – নয় নাম্বার বাসের হেল্পারগণ ]


৩ নভেম্বর, ১৯৯৫

মানুষ স্মৃতিকাতর কথাটা সত্য। কিন্তু এতেই সার্বিকতাকে চিহ্নিত করতে গেলে আমার বিশ্বাস অনেক ফাঁকি থেকে যায়। শৈশবস্থান মিরপুর পাইকপাড়া সরকারী কলোনীকে ছেড়ে যাচ্ছি। প্রায় বিশ বছর আগেরকার এক দিন, এখনো মনে আছে। শুক্রবার ছিলো। কনফার্মড হবার জন্য গুগলে সার্চ করলাম। আই ওয়াজ ডেড রাইট। দিন তারিখ ঠিক ঠিক মনে রাখবার ব্যাপারে আমার বিস্ময়কর ক্ষমতা বরাবরই ছিলো। এই বিস্মৃতিপরায়ন সময়ের বাসিন্দা হয়েও মনে হচ্ছে সেই ক্ষমতা তেমন হারাইনি। দিনটা যে আমার জন্য স্মরণযোগ্য হতে পারে সেটা সেদিন বুঝিনি। আর ২ মাস পরেই আমার আট বছর বয়সে পড়ার কথা। সেদিন বিকাল পর্যন্তই আমার চিরস্থায়ীভাবে আমার শেষ থাকা তবুও তাকে ছেড়ে আসবার বেদনা সেই সময়ে আমাকে আচ্ছন্ন করেনি। অনেস্ট কনফেশন। ৪ নভেম্বর, ১৯৯৫ তার পরেরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে নিজেকে যখন ধানমন্ডি ১৯ নাম্বারে আবিষ্কার করলাম তখন এক ধরণের অনুভূতি হয়েছিলো। বিয়ের পরদিন সকালে উঠে কোন মেয়ের এমন অনুভূতি হয় কিনা কে জানে। হয়তো তেমন কেউই আমার সেই অনুভূতির গভীর পর্যন্ত যেতে পারবে। জীবনে একটা অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটেছে এই বাস্তবতা একটা সাত বছরের বাচ্চা ছেলে যেভাবে বুঝে নিতে পারে আমার ধারণা আমিও সেভাবেই বুঝে নিয়েছিলাম। ২০১২ সালের ৭ অক্টোবরে প্রায় ১৭ বছর পরে যখন আবার গিয়েছিলাম শৈশবস্থানে আমার আনন্দের অনেকখানিই মিলিয়ে গিয়েছিলো। কলোনী থেকে পাঁচ মিনিট দূরত্বে পেছনে যেই সুবিশাল জায়গাটি ছিলো আমার ক্রিকেট খেলা শেখার আঁতুড়ঘর সেটা এখন হয়েছে র‍্যাপিড একশন ব্যাটেলিয়নের ৩ নাম্বার কার্যালয়। হাহ , কোথায় আমার শৈশব আর কোথায় ……………গালি দেওয়াটা এই সময়ে অবশ্য কর্তব্য। তবে শৈশবের গন্ধমাখা লেখা কিনা, নিজেকে তাই বিরত রাখলাম। স্রেফ ছাপার অক্ষরে, চেতনায় নয়।


১৪ ফেব্রুয়ারী, ১৯৯৬

টিভিতে সরাসরি আমার দেখা প্রথম ক্রিকেট ম্যাচ। উইলস ক্রিকেট বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ। ইংল্যান্ড বনাম নিউজিল্যান্ডের খেলা। ন্যাথান এসলের সেঞ্চুরী। যতোদূর মনে করতে পারি সে ১২০ রান করেছিলো। নিউজিল্যান্ড করেছিলো ২৩৯ রান। জবাবে ইংল্যান্ড ২২৮ রানে অলআউট হয়েছিলো (এটাও প্রথমে নিজের স্মৃতি থেকেই লিখেছি, পরে ক্রিকইনফোতে গিয়ে কনফার্মড হতে গিয়ে দেখি যে দুইদলের স্কোর ঠিকই বলেছি তবে এসলের স্কোর ১২০ নয় ১০১ ছিলো)। ছোটবেলা থেকেই নীল আমার প্রিয় রঙ। সেই কারণে ইংল্যান্ড ম্যাচটি হেরে যাওয়াতে মেজাজ খারাপ হয়েছিলো। সেই বিশ্বকাপে তাদের পারফরম্যান্স থেকে শুরু করে দল যতোই প্যাথেটিক হোক না কেন যেহেতু তাদের জার্সির রঙ ছিলো নীল তাই সেই আসরে ইংল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা, ভারত এই ৩ দলের কোন খেলা থাকলে আমি তাদেরকেই সমর্থন করেছিলাম। দিনটির আরো একটা ঘটনা মনে করতে পারি। নিউজিল্যান্ডের ইনিংস শেষে ওয়ার্ড্রবের উপরে চড়ে লাফালাফি করছিলাম। কি আনন্দে সেটা উনিশ বছর পরে তো বটেই সেই সময়েও জিজ্ঞেস করলে বলতে পারতাম না। বাবা–মা উভয়েই আমার অজানা কোন আনন্দের অদ্ভুতুড়ে বহিঃপ্রকাশ দেখে নিজেরাও আনন্দিত হয়েছিলো স্পষ্ট মনে করতে পারি। যূথবদ্ধতার জীবনে এমন সব তুচ্ছ আবার একইসাথে মনোমুগ্ধকর আনন্দের জন্যেই কি নারী-পুরুষ মা-বাবা হিসাবে নিজেদের রুপান্তর ঘটায়? কে জানে। তবে সরাসরি দেখা প্রথম ক্রিকেট ম্যাচের চাইতেও আমার লাফালাফিটাই মনে বেশী করে দাগ কেটে গেছে।


২১ ফেব্রুয়ারী, ১৯৯৬

(১৭ মার্চের আগ পর্যন্ত এই তারিখগুলো স্পষ্ট মনে নেই বলে ম্যাচের তারিখগুলো মনে করবার জন্য ক্রিকইনফোর সাহায্য নিলাম)

আমাদের বাসা থেকে বেশ কাছেই আমার বাবার এক কাকীরা থাকতো পরিবারসহ। এইদিনে তাদের বাসায় গিয়েছিলাম মনে আছে। সে এক চমৎকার জায়গা ছিলো। আমার অসাধারণ সময় কাটতো। মানুষজনও আমার খুব পছন্দের ছিলো। পলাশ ভাইয়া, পিয়াস ভাইয়া, লিনা আপু, কাকা-কাকী কি এক জমজমাট পরিবেশ। এই কথা নব্বইয়ের দশকেও সত্য যে মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্কে কৃত্রিমতা থাকতোই। আমাদের সমাজ দিনের পর দিন মানুষে মানুষে কৃত্রিম সম্পর্কই চেয়ে এসেছে এতো নতুন কিছু না। তবে নব্বইয়ের শেষার্ধ, একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশক এবং দ্বিতীয় দশকের অর্ধেকে এসে যখন লিখছি তখন নির্দ্বিধায় বলতে পারি নব্বইয়ের শেষার্ধে মানুষে মানুষে যে সময়টুকু হাসিআনন্দে কাটতো সেখান থেকে বাচ্চাদের অনেক কিছু শেখার আছে, রোমন্থন করার আছে। এই সময়ে বয়োবৃদ্ধ যারা বেঁচে আছেন তাদেরও আছে।

যাই হোক আবারো ক্রিকেটই চলে আসি।

শচীন টেন্ডুলকার ও বিনোদ কাম্বলি ; প্রাপ্তিসূত্র - http://www.google.com.bd/imgres?imgurl=http://images.indiatvnews.com/sportscricket/Sachins-last9547.jpg&imgrefurl=http://www.indiatvnews.com/sports/cricket/sachin-s-last-test-but-where-is-his-once-closest-friend-vinod--9547.html&h=400&w=570&tbnid=Zz73i51SfcVxIM:&zoom=1&docid=TDOKkLAWoI_XOM&ei=s_rUVPv6MdLIuATrGg&tbm=isch&ved=0CFMQMygfMB8
শচীন টেন্ডুলকার ও বিনোদ কাম্বলি ; প্রাপ্তিসূত্র – http://www.indiatvnews.com/sports/cricket/sachin-s-last-test-but-where-is-his-once-closest-friend-vinod–9547.html

ভারত- ওয়েস্ট ইন্ডিজ ম্যাচ ছিলো। যতোদূর মনে করতে পারি ওয়েস্ট ইন্ডিজ করেছিলো ১৭০ রান। রিচি রিচার্ডসন প্রভাকরের বলে ডিপ স্কোয়ার লেগে ক্যাচ দিয়েছিলো তা স্পষ্ট মনে আছে। তবে মুগ্ধকর অংশ যা ছিলো তা দেখেছিলাম ভারতের ইনিংসে। প্রথমেই কার্টলি এমব্রোজের ক্লিন বোল্ড করে নেওয়া দুই উইকেটের পর প্রথম দেখলাম শচীন এবং কাম্বলিকে। সেদিনও মিশু ভাইয়ের বাসায় তাকে বলতেছিলাম যে আমার শচীনের চাইতেও কাম্বলিকেই প্রথমে বেশী ভালো লাগছিলো। সেটা ১৯৯৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারীতে কাম্বলির ব্যাটিং দেখবার সুযোগ হয়েছিলো বলে। এমব্রোজ, শচীন, কাম্বলি এই ৩ জনের সাথে এদিনই প্রথম পরিচিত হয়েছিলাম। প্রথম দুইজনকে মনে রাখবার মতো মানুষের অভাব হবেনা। সঙ্গত কারণেই। শেষেরজনকে মনে রাখবে আমার মতো কেউ কেউ।


২৭ ফেব্রুয়ারী, ১৯৯৬

নোয়াখালীর মাঈজদীতে। বড় মামার বাসায়। টিভিতে সরাসরি খেলা দেখতে পারছিনা কোন এক ভুলে যাওয়া কারণে। কিন্তু ক্রিকেটের প্রতি আমার ভালোবাসা ততোদিনে নিজের পাতা মেলতে আরম্ভ করে দিয়েছে। তাই মামার বাসায় পুরনো পত্রিকার যেই স্তুপ ছিলো সেটা উলোটপালট করে অতীতের সব ক্রিকেট খেলার স্কোর খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিলাম। আহা, কী আনন্দ!!! কী কৌতূহল!!! প্রথম স্কুলে যাওয়া , প্রথম গল্পের বই পড়া , প্রথম প্রেমে পড়া, প্রথম কারো সাথে শারীরিক ঘনিষ্ঠতা এর কোনটাই আমার পুরনো পত্রিকা ঘেঁটে ঘেঁটে পুরনো খেলার স্কোর খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখবার আনন্দকে অতিক্রম করতে পারেনি। আবেগাক্রান্ত কোন বক্তব্য নয়। নিখাদ বাস্তব। এক আনন্দময় স্বীকারোক্তি। সততই অকৃত্রিম ভালোলাগার। যাই হোক পত্রিকা ঘেঁটে ঘেঁটে অবশেষে গোছানো প্রায় শেষ হয়ে এলে মামাতো ভাই ফয়সল এসে জানালো ভারত ম্যাচটা হেরে গেছে। মনে খারাপ হয়েছিলো। মাঝখানে একবার কেবল দেখেছিলাম যে কাম্বলিকে ডেমিয়েন ফ্লেমিং ক্লিন বোল্ড করেছিলো। সেই যে ফ্লেমিঙকে অপছন্দ করতে শুরু করেছিলাম তারপরে যতোদিনই তাকে দেখেছি অপছন্দ কেবলই বেড়েছে। একটা তথ্য যুক্ত করা যায় তা হলো সেই ম্যাচে ফ্লেমিং ৫উইকেট পেয়েছিলো।

পল এডামস। লেখায় তার কথা নাই। তাও দিলাম, কেননা লেখক নিজেও পরে  চায়নাম্যান বোলিং করতেন। প্রাপ্তিসূত্র - http://news.bbc.co.uk/sport2/hi/cricket/9393914.stm
পল এডামস। লেখায় তার কথা নাই। তাও দিলাম, কেননা লেখক নিজেও পরে চায়নাম্যান বোলিং করতেন। প্রাপ্তিসূত্র – http://news.bbc.co.uk/sport2/hi/cricket/9393914.stm

মার্চ ৯, ১৯৯৬

উফ , এই তারিখে অনেক কিছুই আছে বলে মনে করি লিখবার। সবই ক্রিকেট সংক্রান্ত। প্রথমেই বলা যায় ইংল্যান্ড-শ্রীলঙ্কা কোয়ার্টার ফাইনালের কথা। ইংল্যান্ড প্রথমে ব্যাট করে প্রত্যাশিতভাবেই চ্যালেঞ্জিং কোন স্কোর করতে পারেনি। প্রত্যাশিত বলছি কারণ সেই বিশ্বকাপে তাদের অধিনায়ক ছিলো মাইক আথারটন। শ্রীলংকার ইনিংস দেখবার সময়ে পাওয়া গেলো আসল আনন্দ। বিনোদন। উভয়ই। একইসাথে এই ২টা পেয়ে যাওয়াটা দারুণ। জয়সুরিয়ার এক্সপ্লোসিভ ইনিংস। ৪৪ বলে ৮২ রান। ড্যারেন গফ থেকে শুরু করে পিটার মার্টিন, ফিলিপ ডিফ্রেটাস, ইলিংওয়ার্থকে আধমরা করে জয়সুরিয়া যখন আউট হলো তখন আমি হতভম্ব হয়ে বসে ছিলাম টিভি সেটের সামনে। সেটা কাটতে না কাটতেই আরেক উপাখ্যান। ভারত – পাকিস্তান ম্যাচ।

জয়সুরিয়ার ইনিংসটির লিঙ্ক

টসের সময়ে জানতে পারলাম যে ইঞ্জুরীর কারণে ওয়াসিম আকরাম সেই ম্যাচে খেলছেনা। তার জায়গায় টস করতে এসেছিলো আমির সোহেল। আমার এখনো বিশ্বাস যে সেই ম্যাচে ওয়াসিম আকরাম ইচ্ছা করেই খেলেনি। মোটা অঙ্কের টাকার কারণে। তবে আমার ওয়াকারকে সেই বিশ্বকাপে সত্যিই অসাধারণ লেগেছিলো। যাই হোক ভারতের ইনিংসের চুম্বক অংশ ছিলো একটাই। ওয়াকারের শেষ ২ ওভারে অজয় জাদেজার ৪০ রান নেওয়া। তবে যেহেতু আমার সমর্থন সম্পূর্ণ হেলে ছিলো ভারতের দিকে তাই প্রিয় ওয়াকারের দুর্দশা ভুলে যেতে কষ্ট হয়নি। সাইদ আনোয়ার – আমির সোহেল বেধড়ক মার দিয়েছিলো শ্রীনাথ, প্রসাদকে। তবে একবার তাদের ওপেনিং স্ট্যান্ড ভেঙ্গে গেলে তারপর থেকে নিয়মিত বিরতিতে পাকিস্তান উইকেট হারায়। পাকিস্তানের রান যখন ১১৩ তখন আমির সোহেলকে ক্লিন বোল্ড করে ভেঙ্কটেশ প্রসাদের রুদ্রমূর্তির সাথে পরিচয় সেই প্রথম, সেই শেষ।

প্রসাদ-আমির দ্বৈরথের লিঙ্ক

যতোদূর মনে পড়ে দেরীতে ৫০ ওভারের কোটা শেষ করাতে পাকিস্তানের ২ ওভার কার্টেল করা হয়েছিলো। পাকিস্তান ম্যাচটা ৩৯ রানে হেরে যায়।

সালমান শাহ ও শমী কায়সার। ৯৬ সালেই মারা যান সালমান শাহ। তাকে ভালবাসা। প্রাপিসূত্র - http://www.kazirhut.com/threads/2837/page-2
সালমান শাহ ও শমী কায়সার। ৯৬ সালেই মারা যান সালমান শাহ। তাকে ভালবাসা। প্রাপ্তিসূত্র – http://www.kazirhut.com/threads/2837/page-2

DSC_0568[আল-বিরুনী প্রমিথ – গল্পকার। প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ : ‘এসকেপিস্ট ‘। ]

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s