কবুতর – মেসবা আলম অর্ঘ্য

আমার বাসা ষোলতলায়। ব্যাচেলর ফ্ল্যাট। পশ্চিমমুখী বারান্দা। সামনে একটা নদী চওড়া হয়ে ডানে ঘুরে গেছে। বাঁকের জায়গাটা পাকস্থলির মতো। আকাশ পরিষ্কার থাকলে সকালবেলা নদীর পানি নীল দেখায়।

একজন মানুষের জন্য তেমন কিছু লাগে না। চারশো বর্গফুটের বর্গও অনেক। শোবার ঘর, বসার ঘর, পাকঘর এইসব আলাদা আলাদা করে নাই। সব এক কামরায়। তাতে সমস্যা হয় না। চোখের সামনে একটা নদী থাকার সুবিধা আছে।

বেলা বাড়ে, পানির গাঢ়ত্ব কমে। সন্ধ্যার দিকে এক প্রকার রঙ্গ তামাশা শুরু হয়। মনে হয় ভিন্ন ভিন্ন রঙের একাধিক নদী একটা আরেকটার ঘাড়ে চেপে বসছে। জড়াজড়ি করে ডিগবাজি খাচ্ছে। কে কে পরিষ্কার না। কিন্তু এক ধরণের চুমাচুমি চলছে বলে মনে হয়। সেই চওড়া প্রেমের মধ্যে সূর্য ডুবতে শুরু করে। অনেক পাখি ওড়াউড়ি করে।

ষোলতলার বারান্দা থেকে নিচে তাকালে দেখা যায়, সাত কি আটতলা বরাবর যেই শূন্য- সেখানে পাখি উড়ছে। বেশিরভাগই কবুতর। মাথার উপর পাখি উড়তে দেখা, আর ফ্ল্যাটবাড়ির বারান্দা থেকে নিচে তাকিয়ে উড়ন্ত পাখি দেখা এক জিনিস না। উপর থেকে নিচে দেখলে পরিষ্কার বোঝা যায় পাখিটা শূন্যে সাঁতরাচ্ছে।

কয়দিন ধরে খেয়াল করছি বারান্দায় দুইটা কবুতর আসে। গলা লম্বা করে ডানে বামে তাকায়। বারান্দায় কোনো ভোজ্যবস্তু থাকার কথা না। তবে ওরা মেঝেতে খুট খুট করে। চাপা গলায় ডাকে। ঘুঘু আর কবুতরে মিল আছে। চেহারা ও গলার স্বরে মিল।

ক্লাস ফাইভে পড়ার সময় আমি হাতিরপুলে কবুতর পুষতাম। গ্রীষ্মের এক দুপুরে নিউমার্কেটের হাঁসমুরগির বাজার থেকে একটা মাদি কবুতর কিনেছিলাম। শাদার উপর কালো ছিটা। কবুতরটা খুব সহজে নতুন ঠিকানায় স্থায়ী হয়ে যায় এবং একটা পুরুষ জোগাড় করে। এক মাসের মধ্যে ওদের শিশু আসে।

হাঁসমুরগির বাচ্চা শুরু থেকেই দেখতে ভাল হয়। কবুতরের বাচ্চা তেমন সুশ্রী না। পোতানো কদমফুলের মতো পাতলা, হলুদ হলুদ রোম থাকে সারা গায়ে। আমি সদ্যজাত শিশুটিকে নিয়মিত পরীক্ষা করি। একটু একটু করে চেহারা বদলাচ্ছে। পাখনায়, গলায় রোম ঝরে খোঁচা খোঁচা পালক আসছে। শাদার উপর কালো ছিটা। শিশুটা ক্রমশ বড় হতে থাকে। ইতিমধ্যে মা কবুতর আবার ডিম পাড়ে।

দেখতে দেখতে আমাদের হাতিরপুলের বারান্দায় কবুতর পরিবারে নাটকীয় পরিবর্তন চলে আসলো। প্রথম শিশু ডিম ফেটে বের হবার পর থেকে শুরু করে, পরবর্তী সাত-আট মাস, এক পাগলাটে নিশ্চয়তায়, মাদি কবুতরটি তার এলেম দেখাতে থাকে। ডিম পাড়ে শিশু দেয়। ডিম পাড়ে শিশু দেয়। সবগুলি শিশু দেখতে একই রকম। শাদার উপর কালো ছিটা। তারা দ্রুত ডাগর হয়। নিজেরাও শিশু দিতে থাকে। একবছর পর কবুতরের সংখ্যা দাঁড়ায় মোট চব্বিশটা। খোয়াড়ের উপর খোয়াড় তোলা হয়।

আমি আগে কখনো কবুতর পালি নাই। সুতরাং কবুতরগুলিকে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করি। আমি আবিষ্কার করি যে কবুতর একপ্রকার সামাজিক পাখি। ওদের সামাজিকতা রক্ষা করে চলতে দেখা যায়। যেমন, আমার কবুতরগুলি প্রায় প্রায় হাতিরপুলের আরো বিশ পঁচিশটা কবুতরকে দাওয়াত দিতো। তারা একত্রে বারান্দার গ্রিলে বসে ঝিমাতো। মেঝেতে নেমে একত্রে গম খেতো, হাগু করতো। গম খেতো, হাগু করতো। গ্রিলে উঠে ঝিমাতো। মাগরিবের আজানের সময় হাতিরপুল বাজারের মোড়ের কলোনি বিল্ডিঙের ছাদে এবং আরও কিছু ডিরেকশনে উড়ে চলে যেত।

কবুতরের হাগুতে কোনো গন্ধ হয় না। তথাপি আমার মা বারান্দার মেঝেতে হাগুর প্রলেপ ঘৃণা করতো। উনি কাজের বুয়াকে দিয়ে প্রায় প্রায় মেঝে পরিষ্কার করাতো। আমি কবুতরের গম কিনতাম সেন্ট্রালরোডের মুখের র্যাশন দোকান থেকে। শস্তায় পাওয়া যেত। কবুতরের সামাজিকতা, এবং দাওয়াত খাওয়ানোর অভ্যাস মা অত্যন্ত অপছন্দ করতো। গম কেনার টাকা চাইলে আমাকে তিরস্কার করে বলতো-“এই গম কয়টা যায় তর নিজের কবুতরের প্যাটে?” আমি সমস্যাটা অনুধাবণ করতাম। কিন্তু কোনো সমাধান করতে পারতাম না। কবুতর এমন ভাবে খায় যে এদের আলাদা করে খাওয়ানো সম্ভব না। আমি প্রচন্ড জিদ করে মা’র কাছ থেকে গমের টাকা আদায় করতাম।

দুই বছরের মত কবুতর পেলেছি। তারপর উৎসাহ মরে যায়। এক সন্ধ্যায় ওদের সবাইকে ধরে ধরে জবেহ করি। বাসায় পোলাও করা হয়। বন্ধুবান্ধব ডেকে পায়রার ঝোল দিয়ে পোলাও খাই। এরপর থেকে কোনো প্রকার পাখি পোষার প্রতি আমার কোনো আগ্রহ কাজ করে নাই।

এতদিন পর এই বিদেশে, আমার ষোলতলার ব্যাচেলর ফ্ল্যাটের বারান্দায়, এই কবুতর দুইটাকে দেখে সেই ক্লাস ফাইভের পোষা কবুতরগুলির কথা মনে পড়লো। কয়দিন ধরে খেয়াল করছি বারান্দায় ওরা আসা যাওয়া করে। গলা লম্বা করে তাকায়। মেঝেতে খুট খুট করে।


২/

আচ্ছা, কবুতরগুলি বারান্দায় কী খায়? একটা কবুতর ছাইরঙের উপর শাদা ছিট ছিট, আরেকটা কালো। ওদের দেখলে মজা লাগে। কাছে থেকে জীবন্ত প্রাণী দেখার মজা। একটা শাদা ছিট ছিট। একটা কালো। আমি ওদের নাম রাখলাম দিবা-নিশি।

দিবানিশি কি পাউরুটি খাবে? ট্রাই করে দেখা যেতে পারে। তেমন কিছু না- ছোট ছোট বল বানায় ছেড়ে দেয়া। তবে কিছুদিন পরীক্ষা করে আবিষ্কার করলাম, ওরা আমার দেয়া পাউরুটি খায় না।

প্রথম যে দিন খাওয়াতে গেলাম, ওরা আমার আচমকা আবির্ভাবে চোখের পলকে উধাও হয়ে যায়। পরদিন আমি শিক্ষাপ্রাপ্ত এবং সাবধানী হই। পাউরুটি ছিঁড়ে টিকটিকির ডিমের মতো পিচ্চি পিচ্চি বল বানাই। সন্তর্পণে গড়িয়ে দেই বারান্দার মেঝেতে। আজকে যেহেতু ওদের মনে ত্রাস সঞ্চার করি নাই, দিবানিশি আমাকে দেখামাত্র পিঠটান দেয় না, সন্দেহের চোখে আমার আগাপাশতলা পরীক্ষা করতে শুরু করে। আমি ওদের মধ্যে বিশ্বাস জন্মানোর জন্য মূর্তির মতো সোজা হয়ে থাকি। একদম স্থির। কিন্তু কাজ হয় না। আমাকে ওরা শেষ পর্যন্ত বিশ্বাস করে না। পাউরুটি খায় না। কিছুক্ষণ এদিক ওদিক করে উড়ে চলে যায়।

একই ঘটনা এক সপ্তাহ ধরে ঘটতে থাকে। প্রথম কয়দিন আমার ভিতর তেমন কোনো আগ্রহ কাজ করে নাই। কিন্তু শেষের দিকে মাথার ভিতর কী যেন একটা কুট কুট করতে আরম্ভ করলো।

ওরা আমার দেয়া পাউরুটি খায় না কেন? আমি যে কৈশোরে দুই ডজন পোষা কবুতর জবেহ করে খেয়ে ফেলেছিলাম, ওরা কি সেটা কোনো ভাবে জানতে পেরেছে? তাতো সম্ভব না! কবুতরের এত বুদ্ধি নাই। ওই কবুতরগুলিকে আমি জবেহ করেছি অন্য দেশে। তাছাড়া আমি তো মোরগও জবেহ করেছি। চড়ুইপাখি জবেহ করেছি। কুরবানির ঈদের দিন গরুর গলকম্বল টান টান করে ধরেছি হুজুরের সামনে। ওগুলিকে হত্যা মনে হয় নাই।

পরদিন সকালে দেখি বারান্দায় পাউরুটির বলগুলি নাই। এতে অবশ্য কিছু প্রমাণ হয় না। পিচ্চি পিচ্চি টিকটিকির ডিম দমকা বাতাসে উড়ে গিয়ে থাকবে। মনে মনে ‘দিবা’-‘নিশির’ জন্য আবার অপেক্ষা শুরু করি।

কিন্তু ওরা আর আসে না।

ওদের সাথে আমার আর দেখা হয় না। আমি অপেক্ষা করি। ওরা আসে না। মাথার ভিতর কুটকুটানি বাড়তে থাকে। ভাল লাগে না। খারাপ লাগে। আমার এই খারাপ লাগা দেখে আমি বিস্মিত হই। কিন্তু তাতে খারাপ লাগা কমে যায় না।

কেন ওরা আমাকে ভুল বুঝবে? আমি তো ওদের কোনো ক্ষতি করি নাই। আমি তো পাউরুটির বিনিময়ে কিছুই চাইনা। তারপরেও কেন আমাকে বিশ্বাস করে না?

আমার হজমের সমস্যা বেড়ে যায়। খেতে পারি না। খুব অলস লাগে। গোসল করি না। প্রচুর মদ্যপান করি। মেজাজ কন্ট্রোলে থাকে না। রাস্তা ধরে হাঁটি। নদীর কাছে যাই। টেলিস্কোপে আকাশ দেখি। চাঁদ চুকা। কংক্রিট নষ্ট। নদী খারাপ। আমি অনবরত কেবল পায়রাদুটির কথাই ভাবছি! অপেক্ষা করছি।

কিন্তু ওরা আসে না।

পাঁচ দিনের দিন আকাশ কালো করে বৃষ্টি আসে।

সারা ঘরে বৃষ্টির ছাঁট। মেঝেতে ফেলে দেয়া সিগারেট ফিলটার চুইয়ে তামাকের রস নেমে এসেছে। নদীর পানি গের্নিকার ঘোড়ার পিঠের মতো কালচে।

মন্থর বৃষ্টির ভিতর আচমকা দেখি বারান্দায় টিনের দেয়ালে একজোড়া কবুতর। বসে আছে। একটা ছাইরঙের ভিতর শাদা ছিট ছিট। একটা কালো। ঘাড় কাত করে আমাকে পরীক্ষা করছে।

আয় হায়! কোথায় ছিলা তোমরা?…

'কবুতরের লগে শিশু' - পাবলো পিকাসো ; প্রাপ্তিসূত্র - http://www.wikiart.org/en/pablo-picasso/a-child-with-pigeons-1943
‘কবুতরের লগে শিশু’ – পাবলো পিকাসো ; প্রাপ্তিসূত্র – http://www.wikiart.org/en/pablo-picasso/a-child-with-pigeons-1943

ঘরের ভিতর ঢুকে যাই। কিছুক্ষণ পর আবার তাকাই… দিবা-নিশি পাখা ঝাপ্টায়… উড়ে চলে যাবে নাকি?… ওদের শরীরতো ভেজা। বৃষ্টিতে ভিজে গেছে। ওরা আমাকে দেখে বৃষ্টির ভিতর উড়ে চলে যায়।

কবুতরের কথা যে কাকে বলবো! বলার মতো কিছুই নাই। অথচ দিবানিশির জন্য আমার খুব খারাপ লাগছে। ওরা কেন পোষ মানে না? আমি সন্ধ্যায় নদীর গোল সার্কাসের দিকে তাকিয়ে থাকি। কিছুই দেখি না। একদিন আমার ফ্রিজ নষ্ট হয়ে যায়। পাউরুটি ফাঙ্গাস ধরে যায়। আমি টকে যাওয়া সবুজ পাউরুটি ডাস্টবিনে ফেলতে নিচে গেলাম।

ফেরত এসে তাজ্জব হতে হলো। শাদা-কালো কবুতর দুইটা আবার এসেছে! বারান্দার মেঝেতে সহজ ভঙ্গিতে হাঁটছে।

ওরা আমাকে কাছে আসতে দ্যাখে। চমকায় না। ভয় পায়না।

পাউরুটির বল একটাও অবশিষ্ট নাই। বাতাসে উড়ে গেছে। বৃষ্টিতে ধুয়ে গেছে। আমি ষোলতলার অন্ধকারে ভূতের মতো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আবছা কুয়াশায় একজোড়া শাদা-কালো কবুতর দেখি। ওরাও দেখে আমাকে। গম্ভীর চাপা গলায় ডাকে। যেন কিছু একটা বলতে চাচ্ছে। কী বলছে বুঝতে পারি না। তবে লক্ষ্য করি ওদের ডাক ঠিক কবুতরের মতো না। অনেকটা ঘুঘুর মতো টেনে টেনে ডাকে।


৩/

একদিন দুপুরবেলা আমি হাঁটতে বের হই। ট্রেন স্টেশন লোকে লোকারণ্য। মানুষের ব্যস্ততা। সবার মুখমন্ডলে ছায়া। প্রত্যেকে জানে সে কোন লাইনে যাবে- উত্তর নয় দক্ষিণ, পূব নয় পশ্চিম। এখানে মানুষের লক্ষ্য স্থির।

ভিড়ের ভিতর এক বৃদ্ধ ভদ্রলোককে দেখা গেলো। কম করে হলেও পঞ্চাশটা কবুতর তাকে ঘিরে আছে। আমি আলাপ জমানোর চেষ্টা করি।

“কি সুন্দর দুপুর, না?”
“তা বটে।”
“প্রতিদিন পাখি খাওইয়াতে আসেন?”
“হ্যা। এরা আমাকে চিনে।”
“দেখে তাই মনে হয়!”
“হ্যা। ওই যে দেখতেসেন কালো কবুতরটা, আইজই আসছে। এই এলাকার না। দ্যাখেন কেমন সবদিকে নজরদারি করতে করতে খায়! মাথার ওঠা নামায় একটা রিদমের মত ব্যাপার চইলা আসছে।”
“তাই তো!”
“অবশ্য এটা প্রায় সব পাখির মধ্যেই পাইবেন। সজাগ থাকা। এরা সব সময় সজাগ। যখন ওড়ে তখনো। পাখির ভিতর খামখেয়ালিপনা দেখবেন না।”
“ঠিকই বলছেন। আমার নাম অর্ঘ্য। আপনি?”
“মবি। পরিচিত হয়ে ভাল লাগলো! আপনি কবুতর লাইক করেন?”

আমি উপর-নিচে মাথা নাড়াই। বুঝতে পারি ভদ্রলোক যারপরনাই বাচাল। কথা বলার মানুষ পায় না। কদাচিৎ পেলে থামতে পারে না।

আমি তার বাচালতা কতক্ষণ চলতে দেবো চিন্তা করতে করতে জিজ্ঞেস করি, “ওদের কী খাওয়াচ্ছেন?”
“কবুতরকে কিন্তু যা তা খাওয়ানো যায় না। একটা পরিমিত মিক্স থাকতে হয়।”
“কী রকম?”
“পাখির কলিজা খুব সহজে শর্করা ভেঙে চর্বি বানাতে পারে। তাই তাদের খাদ্যে শর্করার পরিমান থাকতে হয় বেশি। যেই পাখির যত বেশি ওড়াউড়ির স্বভাব, তার তত বেশি শর্করা দরকার। কবুতরের জন্য খুব ভাল হইলো ভুট্টার গুড়া। ভুট্টা ভরা স্টার্চ। কবুতরের ফেভারিট।”
“দোকানে পাওয়া যায়?”
“আমি তো কিনি না, নিজে বানাই। তবে ভুট্টার গুড়া আপনি মুদি দোকানে পাবেন।”
“ও আচ্ছা আচ্ছা। ঠিক আছে মবি সাহেব। শুভ দুপুর।”

সেইদিনই বাজার থেকে কবুতরের দানা জোগাড় করলাম। রহস্য তাহলে খাওয়ানোতে না, খাদ্যে! কবুতর পাউরুটি পছন্দ করে না!

পরদিন সকালে আমার ঘুম ভাঙে বাকবাকুম শব্দে। আগের রাতে ভুট্টার দানা দিয়ে রেখেছিলাম। বিছানায় শুয়ে শুয়ে লক্ষ্য করি শাদা আর কালো দুইটা কবুতর বারান্দায় ভুট্টা খাচ্ছে। আকাশ পরিষ্কার নীল। দগ দগ করছে। উঠে বসি। আরো কিছু দানা ছিটিয়ে দেই। ওরা উড়ে যায় না। ঘুরে ঘুরে খেতে থাকে।

আমার কবুতর খাওয়ানোর পর্ব পুনরায় আরম্ভ হলো। প্রতিদিন খাওয়াই। ওরা ভুট্টা খায়, হাগু করে। ভুট্টা খায়, হাগু করে। বাতাসে সাঁতরিয়ে সাততলার বারান্দায় নামে। ছাদের রেলিঙে ওঠে। নদীর দিকে যায়। কিন্তু যায় না। আবার আসে। ভুট্টা খায়।


৪/

হাতিরপুলে থাকতে আমি অনেক চড়ুইপাখি ধরেছি। চটির ঝাঁকার এক মাথায় রশি বেঁধে অন্যমাথায় দুইটা থান ইট রাখতাম। ঝাঁকার নিচে চাল। চড়ুই চাল খেতে খেতে জায়গা মতো আসলে রশি ছেড়ে দিতে হয়।

ঠিক করলাম কবুতর ধরবো। বাজার থেকে প্লাস্টিকের বড় একটা গামলা কিনে আনি। পিছনে, উপরে কিছু টেক্সটবই রেখে ফাঁদ তৈরি হয়। ততদিনে দিবা-নিশি আমার উপর বিশ্বাস স্থাপন করে ফেলেছে।

কালো কবুতরটা ধরা পড়লো। আমি ঘন্টাখানেক গামলায় হাত দিলাম না। বসে থাক। উত্তেজনা কাটুক। একটু পরই শান্ত হয়ে যাবে। ভুট্টা খাবে।

সন্ধ্যার পর গামলা তুলে কবুতরটি সংগ্রহ করি। পাখনা দুইটা একত্র করে গোড়ায় চেপে ধরি। ছটফট করে। কিন্তু নড়তে পারে না। আমি ওকে রান্নার টেবিলের উপর স্থাপন করলাম। আমার একটা মাংস কাটার বড় ছুরি আছে।

আরেকটা কবুতর জবেহ করতে হবে। এছাড়া ওদের থেকে আমার মুক্তি নাই। ঠিক জবেহ করা যাবে না, যেহেতু মাথাটা টেনে ধরার কেউ নাই। এক কোপে মাথা আলাদা করে ফ্যালা যায়। বেশি ঝামেলার কাজ না।

নিশি, অর্থাৎ ফাঁদে আটক কালো কবুতরটা, অবাক চোখে তাকিয়ে আছে। প্রথমে ছটফট করছিল। এখন ছটফটানি বন্ধ। কোনো সাড়া শব্দ নাই। শুধু তাকিয়ে আছে।

আমি ডান হাতে ছুরির বাঁট শক্ত করে ধরি, এবং টেলিফোন বেজে ওঠে। আমার এক হাতে কবুতর, অন্য হাতে ছুরি। টেলিফোন ধরার কোনো ইচ্ছা আমার নাই। রান্নার টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে টেলিফোন বাজা বন্ধ হবার অপেক্ষা করতে থাকি। এক সময় রিং বন্ধ হয়।

আমি পায়রাটিকে সিঙ্কের কিনারে স্থাপন করি এমন ভাবে যেন মাথাটা সিঙ্কের উপর থাকে। ডান হাতে ছুরির বাঁট শক্ত করে ধরি, এবং আবার টেলিফোন বেজে ওঠে। আমি ছুরিটা টেবিলের উপর রেখে বোতল খুলে কয়েক ঢোক মদ খাই। খেতে খেতে শুনি আবার ফোন বাজছে। ফোন অফ করে দেই। কবুতরটা আমার ডান হাতের পাঞ্জার ভিতর ছটফট করছে।

আমার মুড বদলে যায়। আর জবেহ করতে ইচ্ছা করছে না। আমি মনে মনে অবাক হই। এমন হলো কেন? বারান্দায় ছেড়ে দিয়ে আসি। আরেকটু মদ্যপান করে শুয়ে থাকি।


৫/

কালো কবুতরটাকে আর দেখবো না ভেবেছিলাম। কিন্তু পরদিন ঘুম ভাঙে বাকবাকুম শব্দে। বিছানা থেকে দেখি দিবা ও নিশি বারান্দায় খুট খুট করছে।

উঠি। চা বসিয়ে বাথরুমে যাই। বের হয়ে চা খাই। ভুট্টার প্যাকেট হাতে বারান্দায় আসি। সুপ্রভাত।

কবুতর দুইটা স্থায়ী হয়ে গেল।

বাসা বদল করে এই ছোট বাসায় ওঠার পর আমার পুরানো লেখার টেবিলটা ঘরের ভিতরে আঁটছিল না। বিক্রিও হচ্ছিল না। তার স্থান হলো বারান্দায়। টেবিলটার তিনদিক ঢাকা। দিবা-নিশি, অর্থাৎ কবুতরদ্বয় সেই টেবিলের ভিতরে বসবাস শুরু করে।

এরপর আমি ব্যাস্ত থাকি। অনেক দিন কবুতরের কথা মনে পড়ে না। খাবারও দেয়া হয় না। ওদের কথা আমি প্রায় ভুলে গিয়েছিলাম।

একদিন শুনি বাইরে থেকে চি চি শব্দ আসছে। সেই শব্দে আমার মনে পড়ে বারান্দায় কবুতর থাকে। টেবিলের কাছে গিয়ে উঁকি মারি।

বাহ! একজোড়া শিশু এসেছে। পুরানো লেখার টেবিল, যা আমার বিগত ছয় বছরের সাহিত্যচর্চার সাক্ষী, ষোলতলার খোলা বারান্দায়, পাকস্থলি আকৃতির নদীর উপকন্ঠে, এখন দুইটা নতুন কবুতরের জন্মস্থান।

কালো কবুতরটা মা। সে প্রায় সারাক্ষণ বারান্দার কিনারে বসে থাকে। অন্য কবুতর দেখলে ঘাড়ের রোঁয়া ফুলিয়ে তেড়ে আসে। এমনকি পিতা কবুতরটিকে দেখলেও। আমি প্রায় প্রায় পরীক্ষা করি শিশুগুলি বড় হলো কিনা। খাওয়া খাদ্য দেই। ওরা চি চি করে। মা কবুতর বাকুম বাকুম করে।

একদিন বিকালবেলা বাসায় ফিরে একটা অন্যরকম দৃশ্য দেখলাম। বারান্দার মধ্যেখানে অনেকগুলি পালক পড়ে আছে। টেবিলের ভিতরে কোনো কবুতর নাই। কি হয়েছে অনুমান করার চেষ্টা করি। ওরা গেল কই? শিশুগুলি ইতিমধ্যে উড়তে শিখেছিল কি? মেঝেতে এইভাবে পালক পড়ে থাকার দৃশ্যটা ভাল না। পাশের ফ্ল্যাটের মেয়েটা একটা বিড়াল পালে। অনেক বড় ও কুৎসিত। এই দালানের বারান্দাগুলি টানা। মধ্যে মধ্যে টিনের দেয়াল দিয়ে ভাগ করা। দেয়ালের নিচে অবিভক্ত ফাঁকা জায়গা আছে।

আমার সন্দেহ হয় বিড়ালটা শিশুদের আক্রমণ করেছিল। ধস্তাধস্তি হয়। ধ্বস্তাধস্তি শেষে ওরা পালাতে পেরেছিল না মারা পড়েছিল নিশ্চিত না।

দুই দিন অপেক্ষা করি। কেউ আসে না।

প্রায় এক সপ্তাহ পর, সম্পূর্ণ ভিন্ন দুইটা কবুতরকে বারান্দায় টেবিলের নিচে বসবাস করতে দেখা যায়। এরা বেশ গম্ভীর ও চুপচাপ। যেন বেশ ওয়াকিবহাল যে এই বারান্দায় একটা খারাপ ঘটনা ঘটেছে কিছুদিন আগে।

আমি এই কবুতর দুইটাকে চিনি না। তথাপি অভ্যাসবশত ভুট্টা ছিটিয়ে দেই। ওরাও আমাকে চেনে না। ভয় পায়। উড়ে চলে যায়। আবার আসে। ভুট্টা খায়।

কয়েক সপ্তাহ পর ওদের দুইটা শিশু আসে আমার পুরানো লেখার টেবিলের ভিতরে। শিশুগুলি বড় হতে থাকে। বড় হতে হতে উড়তে শেখে। শহরের অন্যান্য কবুতরদের সাথে মিশে যায়। আমি আলাদা ভাবে আমার বারান্দায় বসবাসরত কোনো কবুতরকে আর চিনতে পারি না। চেনার আগ্রহও বোধ করি না। ভুট্টা খাওয়াই। মেঝে থেকে হাগু পরিষ্কার করি।

আমার এই বাসা ছেড়ে দেয়ার সময় হয়ে আসছে। বারান্দা পরিষ্কার করে যেতে হবে। টেবিলটা ফেলে দিতে হবে। আমি চলে যাওয়ার পর নতুন ভাড়াটিয়া আসবে। কবুতরও আসবে। শহরের বারান্দাগুলিতে কবুতর পালার নিয়ম নাই। খাওয়ানোরও নিয়ম নাই। মেঝে নোংরা হয়। তবু কবুতরগুলি শহরের ফ্ল্যাটবাড়ির বারান্দায় বারান্দায়ই থাকে। এই এলাকায় অনেক কবুতর। বেলা বাড়ে, পানির গাঢ়ত্ব কমে। সন্ধ্যার দিকে এক প্রকার রঙ্গ তামাশা শুরু হয়। মনে হয় ভিন্ন ভিন্ন রঙের একাধিক নদী একটা আরেকটার ঘাড়ে চেপে বসছে। জড়াজড়ি করে ডিগবাজি খাচ্ছে। নদীর প্রেক্ষাপটে ষোলতলার বারান্দা থেকে নিচে তাকালে দেখা যায়, সাত কি আটতলা বরাবর যেই শূন্য- সেখানে পাখি উড়ছে। বেশিরভাগই কবুতর।


1517432_10152145826315056_518945034_n[ মেসবা আলম অর্ঘ্য : কবি, প্রকৌশলী। ঢাকার পুলা, দেশের বাইরে থাকেন,  বিদাশে।  প্রকাশিত গ্রন্থ-গ্রন্থিকা – ‘আমি কাল রাতে কোথাও যাই নাই ’, ‘তোমার বন্ধুরা বনে চলে গেছে ’ এবং ‘মেওয়াবনে গাণিতিক গাধা ’।     – নয় নাম্বার বাসের হেল্পারগণ ]

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s