রুখসানা – মেসবা আলম অর্ঘ্য

পুর্ব ইউরোপের গরীব কোনো শহর। এক সময় সোভিয়েত ব্লকের অংশ ছিল। এখন আর নাই। তবে সোভিয়েত আমলের ধূসরবর্ণ দালানকোঠা এখনো অতীতের স্মৃতি বহন করে গম্ভীর ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রয়েছে। মানুষগুলি স্লোভাকদের মতো; ঠিক ‘পশ্চিমা’ বলতে যা বোঝায় তেমনটা নয়; একটু ভিন্ন ধাঁচের। রুক্ষতা ও পেলবতা মেশানো। জায়গায় জায়গায় অপাংক্তেয় আবর্জনা। প্রায় বাংলাদেশের ‘টং’-এর মতো দেখতে ছাপড়া দোকান— রাস্তার মোড়ে মোড়ে আগাছার মতো গজিয়ে উঠেছে। এবং দীর্ঘকায় ইউক্যালিপটাস গাছ। ইউরোপের যে এমন আটপৌরে একটা রূপও থাকতে পারে, মধ্য বা পূর্ব ইউরোপের এক্স-সোভিয়েত দেশগুলি না দেখলে সেটা বোঝা যাবে না।

আমরা সবাই মিলে বেড়াতে এসেছি এখানে। আব্বা, আম্মা, চাচা, খালা, ফুপু, ভাই-বোন সবাই। সাথে রুখসানাও আছে। রুখসানা আমার দূরসম্পর্কের ফুপাতো বোন। আমার চেয়ে বছর দুয়েকের ছোট। আমাদের ভিতর গত কয়েক মাস ধরে কিছু একটা চলছে। কারো কাছেই বিষয়টা স্পষ্ট না। আবার অস্পষ্টও না। অচেনা শহরের নতুন পরিবেশ আমাদের প্রাণময় করে তোলে।

রুখসানা আমাকে তাড়া করে। আমি দৌড়াই। হি হি করে হাসি। রুখসানাও হাসে এবং তাড়া করে। যেন এক ধরণের খেলা। আম্মা তীক্ষ্ণ গলায় তিরষ্কার করলেন। আমরা হুড়মুড়িয়ে পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেলাম।

আকাশ মেঘলা। তার নিচে দালানের সারি। মধ্যে মধ্যে আকাশচুম্বী ইউক্যালিপটাস গাছ। ভেজা এ্যশফল্ট। গাছ বোঝাই একটা চত্বরকে মধ্যখানে রেখে চক্রাকারে দৌড়াদৌড়ি করছি আমি ও রুখসানা।

অনেকক্ষণ পর থামলাম।

আমাদের সামনে একটা পুরানো ধাঁচের বিল্ডিং। লোহার রেলিং দেয়া ঝুল-বারান্দাগুলি একটার উপর আরেকটা সাজানো। অনেক উপরে উঠে গেছে।

আমি রেলিং বেয়ে দোতলার বারান্দায় উঠে পড়ি। আমার ধারণা এখানে রুখসানা উঠতে পারবে না। কিন্তু আমাকে দেখে সে’ও রেলিং বাওয়ার উপক্রম করলো।

বিকট শব্দে বাজ পড়লো। ইলেক্ট্রিক তারে অনেকগুলি কাক। ঠিক ঢাকা শহরে যেমন হয়— বাজ পড়তেই কাকগুলি কা কা করে ডেকে উঠলো। এই শহরেও এত কাক আছে! অদ্ভুত একটা সময়। দুপুর, নাকি বিকাল? বুঝতে পারছি না। কাদের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছি আমি?

রেলিং ধরে শরীরটা আস্তে ঝুলিয়ে নিচে নেমে আসি। রুখসানাকে বলি আমার পিঠেব্যথা হচ্ছে; আর ছুটতে পারবো না। আমাকে ও জড়িয়ে ধরে ঘাড়ের কাছে কামড় বসায়। তোমার কি ধারণা তুমি আমার থেকে পালাতে পারবা? রুখসানা বলে। উত্তরে আমি চুপচাপ বাসার দিকে হাঁটতে শুরু করি।

বাসা মানে একটা শাদা একতলা বাড়ি— সাতদিনের জন্য ভাড়া নেয়া হয়েছে, বেড়াতে আসা উপলক্ষে। এরকম এক অজ্ঞাতকুলশীল স্লোভাক শহরে গুষ্ঠির সব মানুষ মিলে বেড়াতে এসেছি কেন ব্যাপারটা আমার কাছে স্পষ্ট না। এভাবে আগে তো কোথাও আসাও হয় নাই! ছোট-বড়-মাঝারি আকৃতির অসংখ্য ভাই-বোন কিলবিল করছে চারপাশে। দুইটা কুকুরও এসেছে সাথে। ছোট আকৃতির কুকুর। সারাক্ষণ একটা আরেকটার সাথে মেতে আছে। কামড়াচ্ছে, ধাওয়া দিচ্ছে, লাফাচ্ছে, এ ওর পেটে সেঁধিয়ে গিয়ে ঘুমাচ্ছে— ইত্যাদি। সবার সামনে। অবাধ স্বাধীনতা ওদের। আমার আর রুখসানার এত স্বাধীনতা নাই।

রুখসানা পিপলুর সাথে আইসক্রিম খাচ্ছিলো। দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা আমাকে দেখে এগিয়ে এলো।

খাবা?
কাকে?
আইসক্রিম?
নাহ।
তাহলে কী খাবা?

এই বলে রুখসানা আমার উরুতে হাত রাখে। আমি খপ করে ওর হাত ধরে বাইরের দিকের একটা ঘরে ঢুকে পড়ি। কিছুক্ষণ পর আবিষ্কার করি আমরা শহরের রাস্তা দিয়ে ছুটছি, আবার।

সামনে আমি। পিছে পিছে রুখসানা। আবার সেই ইউক্যালিপটাস গাছ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নীলক্ষেত কোয়ার্টারের মতো দালান— এখানে ওখানে পর্যবসিত। আকাশভরা ঘন কালো থমথমে মেঘ।

দৌড়াতে দৌড়াতে আবার আমরা সেই ঝুল-বারান্দাওয়ালা দালানটার কাছে পৌছে যাই। যথারীতি রেলিং বেয়ে উপরে উঠতে শুরু করি আমি। রুখসানা নিচে দাঁড়িয়ে হাসে এবং হাঁপায়।

এবার শুধু দোতলা পর্যন্ত উঠে ক্ষান্ত হলাম না। একটার পর একটা বারান্দা বেয়ে বেয়ে অনেক উপরে উঠে গেলাম আমি।

ছয়তলা পর্যন্ত উঠে হাঁপাতে শুরু করি। প্রচন্ড পিঠব্যথা করে। দুই হাতে কোমর ধরে ব্যথায় কুঁকড়ে উঠি আমি।

আমার সামনে ইউক্যালিপটাস গাছের প্রায় মগডালের অংশগুলি দৃশ্যমান। রেলিং ধরে নিচে তাকাই। একেক তলার বারান্দার মধ্যে দেড় দুই হাত করে ফাঁকা জায়গা। তরতরিয়ে উঠে গেছি। নামতে গেলে পা হড়কে নিচে পড়ে ভর্তা হয়ে যাবার যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে।

২/

বৃষ্টির পানিতে আর গায়ের ঘামে শরীর চুবচুবা হয়ে আছে। বোটকা গন্ধ আসছে। আমি শার্ট খুলে ফেললাম। পাজামাও খুলে ফেললাম। ঝুম বৃষ্টিতে গোসল করলাম।

চিন্তা করে পাচ্ছি না, বাসায় ফিরবো কখন? কীভাবে? রুখসানাই বা কই গেল? কোথাও তার চিহ্নমাত্র নাই। এটা কার ফ্ল্যাট? দরজায় টোকা দেবো? টোকা দেয়া ছাড়া উপায়ও নাই।

দরজায় হালকা টোকা আমি দেই। অপেক্ষা করি। ভেতর থেকে কোনো আওয়াজ আসে না। আবার টোকা দেই। নিরুত্তর। আবার, আরো মোলায়েম করে টোকা দেই আমি।

তীব্র একটা অস্বস্তি পেয়ে বসলো। যেভাবে উঠেছিলাম, সেভাবেই নেমে যাবো কি? রেলিং বেয়ে? হ্যাঁ— রেলিং বেয়েই নামতে হবে।

খুব সাবধানে, রেলিং টপকে, বারান্দার পিচ্ছিল মেঝের প্রান্তে পায়ের আঙুলে ভর দিয়ে দাঁড়াই। ঘাড় ঘুরিয়ে নিচে তাকাই এবং তৎক্ষণাৎ রেলিং টপকে তেলের মতো বারান্দায় ফিরে আসি।

মেঝেতে একপাটি চটি। ভারতীয় চটি। এই ফ্ল্যাটে কি তবে ভারতীয় কেউ থাকে? আমার আনন্দ হয়, একই সাথে হয় দুঃশ্চিন্তা। আমি তো ভারতীয় নই। বাংলাদেশী। বাংলাদেশী ও ভারতীয়রা সাধারণত একে অপরকে ভাল চোখে দেখে না। অবশ্য ভারতীয় চটি বাংলাদেশীরাও পরে।

আবার দরজায় টোকা দেবার সিদ্ধান্ত নিলাম। আগের টোকাগুলি হয়তো যথেষ্ট জোরালো ছিল না।

টোকা না, বেশ জোরে একখানি কিল আমি দরজার পাল্লায় আরোপ করলাম এইবারে। কপাট ফাঁক হয়ে গেল। একজন মহিলার স্নিগ্ধ, আয়ত মুখ দৃশ্যমান হলো।

মহিলার মুখমন্ডল দেখার সঙ্গে সঙ্গে আমার মনে পড়ে যে আমি ইনাদের ফ্ল্যাটের বারান্দায় জাঙ্গিয়া পরিহিত অবস্থায় দাঁড়িয়ে রয়েছি। ঝট করে উবু হয়ে, যৎপরোনাস্তি দ্রুততায় পাজামা পরি আমি। কিন্তু শার্ট পরার সুযোগ পাই না। তার আগেই মহিলা কথা বলে ওঠেন।

কে তুমি?
জ্বী, আপনাদের বারান্দায় আমি আটকা পড়ছি।
এখানে আসলে কেমন করে?

এই পর্যায়ে, কপাটের ফাঁক দিয়ে, মহিলার মাথার উপর একখানি পুরুষের মাথা দৃশয়মান হয়। মধ্যবয়স্ক, শক্ত সমর্থ চেহারা। চোখের ভিতর এক প্রকার শান্ত দৃঢ়তার ছাপ রয়েছে।

আমাকে উনাদের ছয় তলার ফ্ল্যাটের এই ছোট্ট, ব্যক্তিগত বারান্দায় আবিষ্কার করে ভদ্রলোক মনে হয় না তেমন বিভ্রন্ত হয়েছেন। সহজ গলায় বলেন— ভেতরে আসো। আসো আসো।

আমি আমার ভেজা শার্টটি মেঝে থেকে কুড়িয়ে গায়ে চাপাতে চাপাতে ফ্ল্যাটে প্রবেশ করি। দ্রুত চিন্তা করি আমার গল্পটা কিভাবে ব্যাখ্যা করবো। রুখসানার সাথে দৌড়াদৌড়ির এক পর্যায়ে দালানের রেলিং বেয়ে ছয়তলায় উঠেছি— এই রূপকথা ইনাদের বিশ্বাস করার কোনো কারণ নাই। বরং আমাকে চোর বলে ধরে নেওয়াটাই যুক্তিযুক্ত।

ভদ্রমহিলা একটু দূরে, সোফায় বসেছেন। আমি খাবার টেবিলের পাশে, চেয়ারে। আমার দিকে মহিলা প্রায় প্রায় তাকাচ্ছেন। ভ্রু কুচকে। সেই তুলনায় ভদ্রলোক নিস্পৃহ। চা বানিয়ে হাতে ধরিয়ে দিলেন।

কাপ নিয়ে চুপচাপ বসে থাকি। চুমুক দেই না। কিয়ৎপর বলি, আমি রেলিং বেয়ে বেয়ে আপনাদের ছ’তলায় উঠেছি।

রেলিং বেয়ে এত উপরে উঠে পড়লে? তোমার গায়ে তো অনেক জোর! ভদ্রলোক বলেন। শোনো, এই দেশের পুলিশ খুব ভদ্র। ভয়ের কিছু নাই। আমি ওদের আসতে বলি কেমন? যা জিজ্ঞেস করবে সহজভাবে উত্তর দিও।

আমি বললাম, এই দেশে আমি থাকি না। বেড়াতে এসেছি ফ্যামিলির সাথে। আসলে আমি একটা মেয়েকে ভালবাসি। ওর সাথে ছোঁয়াছুঁয়ি খেলার এক পর্যায়ে…

ভদ্রলোক আমার কথা শেষ করতে দিলেন না, তোমার কথা তুমি পুলিশকে বলো। আমি কল করছি।

তবে রুখসানার প্রসঙ্গ তোলাতে একটা ভাল ফল হলো, ভদ্রলোকের স্ত্রী, যিনি এতক্ষণ থম্‌ ধরে ছিলেন, হঠাৎ কথা বলা শুরু করলেন— বলতো শুনি ঘটনা আসলে কী?

আমি বললম রুখসানা আমার কাজিন। আমরা ছোঁয়াছুঁয়ি খেলছিলাম। এক সময় ওর নাগালের বাইরে যাওয়ার জন্য বারান্দার রেলিং ধরে আপনাদের বিল্ডিঙে ওঠা শুরু করি। আমি আসলে ওকে আমার শক্তি, সাহস দেখিয়ে অবাক করতে চাচ্ছিলাম।

মহিলার কুঞ্চিত ভ্রু ধীরে ধীরে সহজ হয়ে আসে। মুখে হাসি ফুটে ওঠে। এইভাবে কি শক্তি-সাহস দেখানো যায়? তোমার ফ্যামিলি কোথায় উঠেছে?

মহিলার পেলব কন্ঠ আমার দেহের সাহসের সঞ্চার ঘটায়। একই সাথে প্রচন্ড কোমরব্যাথা শুরু হয়। আমি কাত হয়ে মেঝের কার্পেটে গড়িয়ে পড়ি। মাথা উল্টে কোঁকাতে কোঁকাতে বলি, জ্বী, বেশি দূরে না। আপনারা চাইলে দেখাতে নিয়ে যেতে পারি। আমাকে দয়া করে পুলিশে দিবেন না। আমি চোর নই। পুলিশে দিলে আমার সময় মতো দেশে ফেরা হবে না। চাকরিটাও যাবে।

মহিলা বলেন, না বাবা, আমি তোমাকে বিশ্বাস করছি। তোমার কি শরীর খারাপ করছে? আমি বলি, আপনার মতো মানুষ আছে বলেই পৃথিবীটা এখনো … …

ইত্যাকার সদয় বাক্যালাপে অবশ্য মহিলার স্বামী কর্ণপাত করলেন না। ওনার চোয়ালের সুদৃশ্য হাড় আরো দৃশ্যমান হয়ে উঠলো। বিশুদ্ধ উচ্চারণে বললেন, তোমাকে এভাবে ছেড়ে দিলে তো সমস্যা, তাই না? আমরা তো জানি না তুমি কে। কেন ইনট্রুড করলা আমাদের ফ্ল্যাটে। এসব বরং পুলিশই ফয়সালা করুক!

দয়া করে পুলিশ ডাকবেন না। অনেক বেশি ঝামেলা হবে। তারচেয়ে আপনারা আমার বাসায় চলেন।

আচ্ছা? ঠিক আছে, চলো। মিমি, তুমি থাকো, আমি আসছি।

ভদ্রমহিলার নাম জানা হলো। মিমি। রাজপুত নারীদের মতো চেহারা। লম্বা, একহারা। খানিকটা চাপা গাত্রবর্ণ। যথেষ্ট আকর্ষণীয়া। আমি ওনার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি। উনি আমার চোখের ভিতরে। তারপর স্বামীকে বলেন, আমিও যাবো। বৃষ্টি তো থেমেছে। বেড়িয়ে আসা হবে।

৩/

আমি, মিমি ও মিমির স্বামী নিচে নেমে এলাম। ইউক্যালিপটাসের চত্বর ঘুরে ডানে মোড়। তারপর একটু আগালেই বাসা। আমরা আগাতে থাকি।

“এবার বামে মোড় নিলেই আমাদের বাসা। আমরা অনেকে মিলে বেড়াতে এসেছি আপনাদের শহরে”— স্বগতোক্তির মতো উচ্চারণ করি। মিমি হাসিমুখে হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়েন।

কিন্তু বামে মোড় নেয়ার পর আমাদের ভাড়াকরা সেই শাদা বাসাটি দৃশ্যমান হলো না। একটা বাজারের মতো জায়গা দেখা গেলো কেবল। বাড়িটার চিহ্নমাত্র নাই!

প্রচন্ড অবাক হলাম। কই গেল বাড়িটা? নাকি আমি পথ ভুল করেছি? উঁচু গলায় চিৎকার দিয়ে ডাকি— রুখসানা!!… বাজারের লোকজন মাথা ঘুরিয়ে তাকায়। রুখসানার দেখা মেলে না।

আমি ভদ্রলোককে জানাই যে আমার পথ ভুল হয়েছে।

কোমরের ব্যথাটা আবার ফিরে এসেছে। জগৎ সংসার অন্ধকার করে দেয়া ব্যথা। শরীর ভেঙে ফুটপাথে শুয়ে পড়লাম। সাথে সাথে মিমিও এসে বসলেন আমার পাশে। মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে স্বামীকে বললেন, ছেড়ে দাও না! চুরি টুরি তো করে নাই! চোখগুলি দেখো কেমন সরল…

স্বামী ভদ্রলোক ছাড়তে রাজি হন না। কর্কশ গলায় প্রশ্ন করেন, কী হয়েছে তোমার?

জ্বী… পিঠেব্যথা… কোমরের দিকে।

উঠে বসো।

আমি বহু কষ্টে, হাঁটুতে হাত দিয়ে লিভারের মতো ঠেলে সোজা করি নিজেকে। ভদ্রলোককে বলি পথ ভুল হয়েছে। এই শহর তো তেমন চিনি না! মনে হয় অন্য দিকে যেতে হবে, মোড় থেকে ডানে।

আচ্ছা চলো।

আমরা আবার হাঁটা শুরু করি। মোড়ে পৌছে নাক বরাবর অন্য আরেকটা বাজারের দেখা পাই। সম্পূর্ণ অচেনা সব দালানকোঠা দুইপাশে। আমাদের ভাড়াকরা সেই শাদারঙের একতলা বাড়িটির চিহ্নও কোথাও নাই!

ছুরির মতো ঠান্ডা একটা বাতাস— শরীর কাঁপিয়ে চলে যায়।

কোথায় আমি? রুখসানা কোথায়? আমার ভাইবোন, আত্মীয় পরিজন— সবাই কোথায় চলে গেলো আমাকে এই বিদেশে একা ফেলে?

মিমির অনুরোধ উনার হাজবেন্ড কবুল করলেন না। পুলিশে কল দিয়ে দিলেন।

কোমরব্যথা ক্রমশ মাত্রা ছেড়ে যায়। মেরুদন্ডের নিচের দিকে কোথাও মাংসপেশীগুলি জমাট বেঁধে গেছে। সামান্য নড়াতে গেলেই যন্ত্রণায় নিশ্বাস বন্ধ হয়ে যায়, চোখে অন্ধকার দেখি।

আবারো হাঁটু মুচড়ে ফুটপাথে শুয়ে পড়লাম চিৎ হয়ে। পড়ে থাকলাম। মিমি মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। উনার স্নেহভরা আঙুলের স্পর্শে আমার চেতনা লোপ পায়। একটা স্বপ্নের ভিতর তলিয়ে যেতে শুরু করি আমি। কিংবা স্বপ্ন নয়। স্মৃতির কোন অতল থেকে একের পর এক দৃশ্য যেন চোখের সামনে উদয় হতে থাকে। অনেক পুরানো, ছোটবেলার স্মৃতি।

শারীরিক যন্ত্রণা ভুলে সেই স্মৃতির ভিতর আমি ঢুকে পড়লাম।

ছয়-সাত বছর বয়সের কথা। রুখসানা ও অন্যান্য ছোট ছোট ভাইবোন। হাতিরপুলের পুরানো বাড়িতে।

হরিণের পালের মতো লাফিয়ে লাফিয়ে ছুটছি আমরা— এই উঠান থেকে ওই উঠান। পেয়ারা গাছের গুঁড়ি ধরে চরকির মতো পাক খাচ্ছি। শুকনা মরা চামড়া হাতের ঘষায় ঝুরঝুর করে ঝরে পড়ছে গাছের গুঁড়ি থেকে উঠানের মাটির উপর। আমগাছটার কালো, রুক্ষ গায়ে হাত রাখছি। হালকা ছত্রাকের মতো উঠে আসছে কী যেন। বহু বছর পুরানো কোনো হেমন্তের বিকাল। তেরছা আলো নেমে এসেছে হাস্নুহেনা ঝোপের ফাঁক গলে বারান্দায়, খাবার টেবিলে। তখনো আমাদের পরিবার একান্নবর্তী ছিল। দুইবেলা সবাই এক টেবিলে বসে খেতো। পাশে গ্রিল দিয়ে ঘেরা বারান্দার রেলিং। একপাশে মুখামুখি মিট্‌সেফ। রান্নার চুলা। অন্যধারে হাত ধোয়ার বেসিন। কলপাড়ের বিপরীতে বাউন্ডারি দেয়াল— পুরানো পলেস্তারা। হাত রাখছি আর খসে খসে পড়ছে। তবু হাত বুলিয়ে যাচ্ছি আমি। বালুর দানা, চুনের পাউডার লেপ্টে যাচ্ছে হাতে। সোঁদা গন্ধ আসছে। কী আশ্চর্য স্পষ্ট! একটা জলজ্যান্ত ছায়াছবির মধ্যে ঢুকে পড়েছি আমি! বহু বহু পুরানো একটা সময়। যেন ছয় বছর বয়সের বালক আমি’র শরীরে বহুদূর থেকে এসে ভর করেছি ছত্রিশ বছরের যুবক এই আমি।

এই তো গোসলখানার সেই অন্ধকার চৌবাচ্চাটি! উপরে টিনের চাল! চৌবাচ্চার কালো কুচকুচে পানির ভিতর পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকানোর চেষ্টা করি আমি। পারি না। আবার চেষ্টা করি। পারি না। আবার চেষ্টা করি— কী একটা শক্তি যেন চৌবাচ্চার ভিতরে স্পষ্ট করে তাকাতে দিচ্ছে না। অন্য দিকে চোখ ঘুরিয়ে দিচ্ছে। আমি হাল ছাড়ি না। প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাই। অনেকক্ষণ পর পানিগুলি স্পষ্ট হতে শুরু করে।

কী গভীরভাবে দুলছে সবকিছু! যেন একটা গলিত আয়না। চালের ফুটা দিয়ে সূর্যরশ্মি এসে ঢুকেছে সেই আয়নায়। রশ্মিটাও দুলছে। যেন ভূমিকম্প হচ্ছে মাটির নিচে গভীর পাতালে কোথাও। চৌবাচ্চাটি দুই হাতে ধরে ডানে-বামে ঝাঁকিয়ে যাচ্ছে কেউ। এবং সেই কালো, কুচকুচে, অতল পানির ভিতর আস্তে আস্তে পরিষ্কার হয়ে উঠছে একটা উঠান। একটা আমগাছ। সুন্দরবনের হরিণপালের মতো লাফিয়ে লাফিয়ে দৌড়াচ্ছি আমরা— আমগাছে পাক খেয়ে শিউলি গাছের দিকে। খিল খিল করে হাসছি— লিচুগাছের কিনারে। লিচুপাতা ঝরে আছে উঠানের উপর। শিউলি ঝরে আছে। হেমন্তের বিকালবেলা।

হঠাৎ গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি শুরু হলো। উঠানের একপাশে লিলিগাছের সারি। বৃষ্টির পানি লিলির পাতা ভিজিয়ে দিলো। মুনলাইট সোনাটা’র পিয়ানো মতো নিবিড় লিলিপাতার দেহ। এখন ফুলহীন। তা’ও কী অপূর্ব সুন্দর! ওদের গা বেয়ে নেমে আসছে বৃষ্টির পানি, নুরুমামার ঘরের দিকে চলে যাচ্ছে। নারিকেল তেলের গন্ধ। মশলার গন্ধ। কলপাড়ে টিপ টিপ করে ফোঁটায় ফোঁটায় পানি পড়ছে সবুজ রঙের প্লাস্টিকের কল থেকে।

দেয়ালের অন্যদিকে আবলানদের বাসা। ওদের গোসলখানার সামনে, কচুগাছের কিনারে আবলানের বোন রুখসানা বসে আছে। শ্যাওলাধরা বিছানো ইটের উপর। খালি পা। এক মনে তাকিয়ে আছে পাকঘরের দিকে। রুখসানার চোখ সুচিত্রা সেনের মতো মায়াময়। ওদের বাসার ঘড়িতে ‘ফর এলিস’ বাজছে। প্রতি ঘন্টায় ওদের বাসার দেয়াল ঘড়ি থেকে তীক্ষ্ণ, যান্ত্রিক সুরে ফর এলিস বেজে ওঠে। ঢেউটিনের দেয়াল ভেদ করে সেই সুর ভেসে এসে মিশে যায় জর্দা দেয়া পানের গন্ধে। বুবু পান খায়। বুবুর শাড়িতে, বিছানা-বালিশে পানের গন্ধ আর মসুরের ডালের সুবাস মিলেমিশে থাকে।

একটা শাদা বেড়াল মিটসেফের দিকে হেঁটে যাচ্ছে। কাক ডাকছে। চড়ুই, শালিক ও কাক—একত্রে ডাকছে। আমাকে মুখে তুলে ভাত খাওয়াচ্ছে মা। আমার মা— কতই না তরুণী সে! মাথাভরা ভেজা চুল। শুকনা মাড়ে ফুলে থাকা সুঁতির শাড়ি পরনে। আমাকে লাউ দিয়ে রান্না করা শোল মাছের ঝোল সমেত লোকমা লোকমা ভাত খাওয়াচ্ছে, আর বুবু’র সাথে কথা বলছে। শীত শীত হেমন্তের বিকাল। ঠান্ডা একফালি আলো, হাস্নুহেনার ঝোপের ফাঁক গলে নেমে এসেছে মা’র মুখের একপাশে।

লাউ দিয়ে শোলমাছ আমার বিস্বাদ লাগে। বেসিনের পাশ দিয়ে এক দৌড়ে আমি উঠানে চলে আসি। আবার ছোঁয়াছুঁয়ি খেলা আরম্ভ করি। এই উঠান থেকে ওই উঠান। বিকাল ক্রমে সন্ধ্যা হচ্ছে। ছায়া নামছে। নরম নরম সব ছায়া। টিনের চালে পেয়ারাপাতা ঝরছে বাতাসে। খস্‌ খস্‌ শব্দ তুলে গড়িয়ে পড়ছে উঠানের উপর।

৪/

কতক্ষণ অচেতন হয়েছিলাম বলতে পারবো না। খস্‌ খস্‌ শব্দে চোখ মেলে তাকাই। তখনো আমি কাটাগাছের মতো নিথর হয়ে শুয়ে আছি ফুটপাথে। মাথা বরাবর একটা পুলিশের গাড়ি ব্রেক কষে থেমেছে, ফুটপাথের কিনারে। দরজা খুলে ইউনিফর্ম পরিহিত কেউ বার হচ্ছে। কালো বুট। নীল ট্রাউজারের মাথা বুট পর্যন্ত পৌছে সুন্দর করে শেষ হয়েছে।

একটা নারীকন্ঠ শুনতে পাই। ঘাড় কাত করে দেখি অফিসারটি একজন মহিলা।

কী আশ্চর্য!

রুখসানা!

আমার দিকে হাসিমুখে তাকালো একবার। পর মুহূর্তেই মুখ কঠিন হয়ে গেল। নারীকন্ঠটি বললো— উঠে বসেন।

আমি উঠে বসি। রুখসানার বুকের কাছে ব্যাজ। তাতে নাম লেখা— ‘নাতালিয়া’।

নাতালিয়া জেরার ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করে, ইনাদের বারান্দায় কী করছিলেন?

আমি বললাম রুখসানা, আমাকে চিনতে পারছো না?

রুখসানা কে?

রুখসানা আমি কবির! বাসার সবাই কই?

কী আজে বাজে বকেন? আমি রুখসানা নামে কাউকে চিনি না।

কী বলতেছো? আমরা না দুপুরবেলা ছোঁয়াছুঁয়ি খেললাম! আমি দালান বাওয়া শুরু করলাম। পরে তুমি কই চলে গ্যালা আমাকে একা ফেলে?

আপনি কি ড্রাগ খেয়েছেন?

ড্রাগ খাবো কেন?

কেন খাবেন আমি কী জানি! দেখি, উঠেন তো?

রুখসানা এসব কী হচ্ছে! এমন করছো কেন? আমি কবির! আমি কবির! চিনতে পারছো না?

দুঃখিত, আপনার নামে ইন্‌ট্রুশনের অভিযোগ আছে। আপনাকে একটু আসতে হবে আমার সাথে।

মিমি এবং তাঁর স্বামী তাকিয়ে তাকিয়ে নাটক দেখছেন।

রুখসানা আমাকে তার গাড়ির পেছনের সিটে ওঠায়। ব্রেথলাইজার দিয়ে পরীক্ষা করে মদ খেয়েছি কি না। তারপর গাড়ি চালাতে শুরু করে।

সবকিছু কেমন এলোমেলো লাগছে। কোন দেশ এটা? কোন শহর? রুখসানার নাম নাতালিয়া কেন? ও আমাকে চিনতে পারছে না কেন? কে চিনতে পারবে আমাকে? আব্বা, আম্মা, চাচা, খালা, ফুপু, ভাই-বোন— ওরা সব কই?

কিছুই ভাবতে পারি না। চলন্ত গাড়ির জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকি। অন্ধকার হয়ে আসছে। মেঘ নেই। পূবদিকের আকাশ নীলকান্তমণির মতো নীল। তার নিচে সোভিয়েত আমলের পুরানো দালানগুলি পড়ন্ত রোদে ঝলসে যাচ্ছে।

একের পর এক মোড় ঘুরছে রুখসানা। ও কি সত্যি রুখসানা নয়?

সম্পূর্ণ অচেনা একটা শহর। শুধু ইউক্যালিপটাস গাছগুলি চেনা চেনা লাগে। আর ঢাকার নীলক্ষেত কলোনির মতো কিছু বিল্ডিং, এখানে সেখান। আবর্জনা। টং-দোকানের মতো দোকান। দ্রুত পিছনদিকে সরে সরে যাচ্ছে সবকিছু। একটু আগে স্বপ্নে দেখা চৌবাচ্চাটির কথা মনে আসে আমার। কী ভয়ঙ্কর দুলছিল পানিগুলি। অতল অনন্ত যেন। ওই অতল-অনন্তের মানে কী? আমি কি মারা যাচ্ছি?

শব্দহীনভাবে গাড়ি চালাচ্ছে রুখসানা। রিয়ারভিউ মিররে দেখছে আমাকে মাঝে মাঝে, চোখের কোণা দিয়ে। সত্যিই কি চিনতে পারছে না? কোথায় নিয়ে যাচ্ছে আমাকে সে?

___

গপ্প সহিত ড্রইংঃ মহসিন রাহুল


[ মেসবা আলম অর্ঘ্য : কবি, লেখক,  প্রকৌশলী। ঢাকার পুলা, দেশের বাইরে থাকেন,  বিদাশে।  প্রকাশিত গ্রন্থ-গ্রন্থিকা – ‘আমি কাল রাতে কোথাও যাই নাই ’, ‘তোমার বন্ধুরা বনে চলে গেছে ’, ‘মেওয়াবনে গাণিতিক গাধা ’, ‘তোমার সাথে আক্ষরিক’।  – নয় নাম্বার বাসের হেল্পারগণ ]

One comment

  1. এক নিশ্বাসে পড়লাম । রোমাঞ্চকর , স্পিডি গল্প । অসাধারণ
    রাইটিং।রাতে দু:স্বপ্ন দেখার মতো পরিস্হিতি তৈরী করে, যা
    কিনা আসলে ভয় লাগলেও ভালো লাগে। একদম surreal.

    Like

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s