ও পারে রবীন্দ্রনাথ আর এ পারে ওমর আলী

“তেমনি আমার একটা পথ হলো যে, আমি বিভিন্নভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছি। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নিজের একটা পথ বেছে নিয়েছি…”

কবি ওমর আলী’র একান্ত সাক্ষাৎকার

বৈঠকখানায় আলোচনা শেষে আমরা সিদ্ধান্ত নেই আমাদের সূচনা সংখ্যায় কবি ওমর আলী’র সাক্ষাৎকার ছাপা হবে। প্রচেষ্টা শুরু হলো। কিন্তু অসঙ্গতি অনেক। যত দূর জানা গেল, কবি ওমর আলী স্বভাবে ও স্বাভাবিকতায় আর পাঁচজন নাগরিক কবির ধরন-ধারণের দিক থেকে আলাদা রকমের। বাস্তবে তার চেয়ে আরেকটু কঠিন হবে এমন ধারণা নিয়েই আমরা ঢাকা থেকে পাবনার কোমরপুরের দিকে কাকভোরে রওনা হয়ে যাই দুইজন– রাদ আহমদ ও সিদ্ধার্থশঙ্কর ধর। যথা নিয়মে যোগাযোগের জাতীয় সেবা গ্রহণের কল্যাণে জ্যামিতিক অল্প-দূরত্বের পথ পেরোতে কেটে যায় সাত সাড়ে-সাত ঘণ্টা। কিন্তু ভাগ্য ভাল। কবিকে পেয়ে যাই একা। কবিকে একা পেয়ে আশা করি সাক্ষাৎকার অনেকটা বস্তুনিষ্ঠ ও ভাব-নিরপেক্ষ হবে। বাস্তবেও তা’ই হলো। স্বভাবে ও মনে যা তিনি বিশ্বাস করেন এবং সত্য বলে উপলব্ধি করেন, সেখান থেকেই কথা বলতে শুরু করলেন। বাসে, অটোতে, ভ্যান ও রিক্সায় চড়ে, এবং অবশেষে পায়ে হেঁটে কিছুটা কাঁচা রাস্তার পথ পেরিয়ে পৌঁছে যাই কবির অবসর কাটানো বারান্দায়। শিক্ষকতা থেকে অবসর নিলেও বারান্দায় কয়েকটি কাঠের চেয়ার, টেবিল ও বেঞ্চ বলে দিল অন্যকিছু– এখনো ছেলে মেয়েদের দেখিয়ে দেয়ার সেবাদান থেকে হয়তো অবসর গ্রহণ করতে পারেননি তিনি। আর কোমলমতি শিশুদের সাথে গল্প করেই যে সারাবেলা কাটে তারও প্রমাণ পেলাম। তিনি শিশুদের নাম রাখতেও পছন্দ করেন খুব।

[গুছিয়ে বসতে বসতে হালকা ঠাট্টা শুরু হলো। ]

সিদ্ধার্থশংকর ধর: আমরা তো কবি ওমর আলীর কাছে এসেছি। তিনি কি বাড়িতে আছেন?

ওমর আলীঃ হ্যাঁ, আমিই ওমর আলী। আমিই কবি ওমর আলী। …মানে ও পাড়ে রবীন্দ্রনাথ আর এ পাড়ে ওমর আলী [কবি ওমর আলীর বাসস্থানের পাশ দিয়ে চলে গেছে শিলাইদহ রোড। মাইল দেড়েক পরেই পদ্মা। পদ্মার ওপারেই রবীন্দ্রনাথের শিলাইদহের কুঠিবাড়ি অবস্থিত]। আমরাই তো দুইজন কবি। এখানে আর কোনোও কবি নেই। হা… হা… হা…।

সিদ্ধার্থশংকর: আপনার বই তো আমরা খুঁজে পাইনা। ঢাকায় এই একটা বড় সমস্যা। আমাদের কবিদের বই আমরা প্রয়োজন মতো খুঁজে পাইনা।

ওমর আলী: বই পাবেন ওই “ইত্যাদি” তে।[ ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ]

সিদ্ধার্থঃ যাই হোক, আমরা আসতে চাইছি কবি ও কবিতার কাছে। এখন বলুন, আপনি কেমন আছেন?

ওমর আলী আপনারা হয়তো জানেন, আমার স্ট্রোক হয়েছে কয়েক মাস আগে। এখন অনেকটা সেরে উঠছি। খুব তাড়াতাড়ি সেরে উঠবো বলে আশা করছি।

রাদ আহমদ:  আপনার কবিতায় একটা বিশেষ দিক হলো স্পষ্টতা। প্রথম থেকেই খুব স্পষ্ট কিছু কবিতা লিখেছেন, কিন্তু এই স্পষ্টতার  মধ্যেই কোথায় যেন একটা যাদু ঘটিয়ে ফেলেন। তো এটা নিয়ে কিছু বলবেন কি, যে, অন্যান্যদের কাছ থেকে আপনার কবিতা এই অন্যরকম হলো কেন। আপনি এটা নিয়ে কখনো ভেবেছেন?

ওমর আলী: এটা আমার মনে হয় যে আমি যে কবিতাগুলো লিখেছি, সেগুলা আমার নিজস্ব। কাউকে অনুসরণ করিনি। যেমন ধরেন প্রত্যেকেরই নিজস্ব একটা পথ আছে। জীবনানন্দ দাশের একটা পথ আছে। তারপর রবীন্দ্রনাথের একটা পথ আছে। তেমনি আমার একটা পথ হলো যে আমি বিভিন্ন ভাবে পরীক্ষা নিরীক্ষা করেছি। পরীক্ষা নিরীক্ষা করে নিজের একটা পথ বেছে নিয়েছি। যেমন গ্রামের কথা, নদী, তারপর গাছপালা, পাখি, এ সমস্ত কথা বলি

রা.আ: আপনার কিছু নাগরিক কবিতাও আছে …

ও.আ: নাগরিক কবিতা অল্প আছে আরকি। তবে বেশির ভাগই গ্রামের কবিতা। গ্রামের নারীদের নিয়ে লেখা। বিশেষ করে নারী।

রা.আ:  অনেকে যে বলেন, কবিতায় রহস্য বা “মিস্ট্রি”-এর একটা দরকার আছে। আপনার কবিতায় বাক্যে বা চিত্রে রহস্যময়তা না থাকলেও অনেক কবিতাই তো আমরা রসোত্তীর্ণ হিসাবে গ্রহন করি। এটা নিয়ে কখনো একাডেমিক ভাবে ভেবেছেন কি যে কবিতার মিস্টরি বা রহস্যয়তা …

ও.আ: না। এটা নিয়ে আমি কখনো চিন্তা করিনি।

রা.আ: গ্রামের প্রসঙ্গ বলতে মনে পড়ল যে, এই যে আমরা এখানে আসলাম, বেশ সুন্দর আর ছিমছাম, নিশ্চুপ একটা গ্রাম, শহর থেকে মোটামুটি একটু দূরে –

ও.আ: মাইল খানেক দূরে আরকি-

রা.আ: তো গ্রামে কি আপনি বরাবরই থাকতে চেয়েছেন?

ও.আ: বরাবরই মানে? প্রথম থেকেই আছি তো। মনে হচ্ছে যে এইভাবেই জীবন কাটায়ে দিব।

সি.শ: নাকি নগরের প্রতি আপনার কোনো ঘৃণা বোধ …?

ও.আ: না আমার কোনো ঘৃণা নেই। নগরের ব্যাপার হলো যে, এর কৃত্রিমতাগুলা [অস্পষ্ট] মনে হয় আমার কাছে। আসল যে জিনিস, সেটা পাওয়া যায় না। বুঝতে পারছেন জিনিসটা…?

সি.শ: সেই কৃত্রিমতাগুলা কী আসলে?

ও.আ: কৃত্রিমতা বলতে ধরেন যে সেখানকার জীবনযাত্রা … জীবনযাত্রাটাই কৃত্রিম মনে হয়। আচ্ছা। আর এছাড়াও আমাকে  প্রেরণা দেয় যেটা …সেটা হচ্ছে যে … গ্রামের মানুষ প্রেরণা দেয় বেশি। গ্রামের মানুষ, যদিও তাদের মধ্যে অশিক্ষার জন্য অনেকটা কৃত্রিমতা আছে; তারা অনেক কিছু নিজের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য করে, কিন্তু তবু তারা প্রকৃতপক্ষে ভালো। সরল, সাদাসিধে।

সি.শ: নগরের যে মূল্যবোধ, যে কৃত্রিমতা এটা কি আপনাকে খুব বেশি কষ্ট দিয়ে ফেলেছে?

ও.আ: হ্যাঁ দিয়েছে তো।

সি.শ: ধরেন আপনার কোনো বন্ধু হতে পারে, আপনার সম্পাদক বন্ধু হতে পারে যার কোনো নাগরিক আচরণে আপনার ভেতরটা …?

ও.আ: হ্যাঁ আছেই তো। নাগরিকতার মধ্যে পরে। মানে কৃত্রিম, মানে তার যে জীবনযাত্রা … বাইরে আসলে একরকম আর শহরে যখন যায় তখন একরকম ।

রা.আ: ঢাকায় যে কবিরা আছেন, আপনার সমসাময়িক, আপনার সিনিয়ার বা আপনার জুনিয়ার, তাদের মধ্যে অনেকে তো শহরের ডামাডোলের মধ্যে থেকে, অথবা, সাহিত্যের পরিধি যদি আমরা বলি, তার কেন্দ্রে অবস্থান করে অনেক কিছু করেছেন। সাহিত্যমহলে একটা অবস্থান তৈরী করে নিয়েছেন।

ও.আ: তারা আসলে বিশেষ করে লোভে পড়ে, নিজেদের লোভ যেটা – সেটা সামলাতে পারেনি। যার ফলে হচ্ছে কি, তারা এমনকি যেটা সস্তা সেটাই গ্রহণ করেছে।

রা.আ: সেক্ষেত্রে আমরা যদি বড় মাপের কবি সাহিত্যিকদের কথা বলি, যেমন শামসুর রাহমান বা সৈয়দ শামসুল হক, শহীদ কাদরী বা আল মাহমুদ, এনাদের বিষয়ে আপনার মূল্যায়ন কী। উনারা যেমন ভাবে নগরে থেকেছেন, এবং একটা কবি খ্যাতি অর্জন করেছেন, একটা না একটা পর্যায় …

ও.আ: ওরা কী পেয়েছেন, সেটা কিন্তু অস্থায়ী। তাঁরা প্রকৃতপক্ষে স্থায়ী কিছু যে পেয়েছেন তা না। অস্থায়ী। এখন মনে হচ্ছে যে তারা যা লিখেছেন তার মধ্যে অনেক কিছুই অস্থায়ী হিসাবে গণ্য হবে। সেগুলা টিকবে না।

রা.আ: কবিতা তাহলে আপনার কাছে আরও গাঢ়, আরও গভীর আরও স্থায়ী একটা ব্যাপার …?

সি.শ: আমার ধারণা মানে যেটা আপনি ইয়ে করছেন, তাদের মেকিং এর চমৎকারিত্ব মানে প্রকরণে তাদের যে চমৎকারিত্ব আছে, কিংবা দর্শনের ক্ষেত্রে উত্তীর্ণ –

ও.আ: না। ঐরকম, মানে, তৈরী প্রকরণই নাই অনেক ক্ষেত্রে …

সি.শ: ধরেন আল মাহমুদের সোনালী কাবিন…এইটা…?

ও.আ: এইটা কয়েকটা খালি সনেটের ব্যাপার। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে তাঁর ঐ কবিতাগুলা প্রচার হয়ে গেছে। ওইরকম সনেট তো আমিও লিখেছি অনেক। আমার বেলায় ইয়েতে আসেনাই, তার বেলায় এসেছে।

সি.শ: প্রকাশ্যে না আসার কারণ হিসাবে আপনি কাকে খাড়া করবেন?  রাজনীতি না মিডিয়া?

ও.আ: মিডিয়া, রাজনীতি দুটোই বলতে পারেন। কিন্তু পরে তারা দেখেছে যে তাদের অনেককিছু মেকি। মানে আসল জিনিসটা তারা ধরতে পারেনাই।

রা.আ: আল মাহমুদ সাহেবের সাথে আপনার বুঝি একধরণের সখ্যতা ছিল? পরিচয় ছিল?

ও.আ: হ্যাঁ সখ্যতা ছিল, পরিচয় ছিল। ছোটবেলা থেকেই আল মাহমুদের সঙ্গে আমার পরিচয়। আমি এগারো বছর ঢাকায় ছিলাম তো। এর মধ্যে আমার [অস্পষ্ট] হয়ে উঠেছে আল মাহমুদের সাথে থেকেই । তারপরে তো আমি চলে আসলাম পাবনায়। ৬০ কি ৬১ সালে। আর যাইনি।

রা.আ: ৬০ বা ৬১ সাল তো একটা বড় বিষয় এই অর্থে যে আমরা ঐ সময়কার যাঁদেরকে প্রতিষ্ঠিত কবি বলি তাঁরা উঠেছিলেন ঐ সময় থেকে শুরু করে পরবর্তী এক দশক ধরে। ৬৮, ৬৯ এর সময়কার রাজনৈতিক/সাংস্কৃতিক পটভুমি তাঁদের অনেককে সামনে নিয়ে আসে। তো ঐ সময়টাতে আপনি ছিলেন পাবনাতে? শিক্ষকতায় ছিলেন?

ও.আ: হ্যাঁ এই – এই জন্য আমি মিশিনি। এই সময়টাতে আমি ওদের সংগে তেমন মিশিনি।

রা.আ: পাবনাতে ছিলেন?

ও.আ: হ্যাঁ পাবনাতে, রাজশাহী, বগুড়ায়…

সি.শ: আপনার অধ্যাপনা জীবনের সাথে কবি জীবনের সম্পর্ক কিরকম?

ও.আ: কবি জীবনের সম্পর্ক বলতে এই যে ওটা অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িত। অধ্যাপনা থেকে কবিসত্বাকে বাদ দেওয়া যাচ্ছেনা।

সি.শ: কখনো কি মনে হয়েছে এই অধ্যাপনা কবিজীবনে বাধা বা অন্য কোনো সংকট তৈরী করল? দ্বন্দ তৈরী করেছে?

ও.আ: আচ্ছা করেছে যেমন, আমার কবিতাগুলি প্রচার হয়নি। পড়ে রয়েছে আরকি। এক আধটা কবিতা ছাপা হয়েছে । তাদের এক এক জনের সাত আট টা করে কবিতা প্রচার হয়ে গেছে। এবং পরে দেখা গেছে যে তাদের অনেকগুলা মেকী। আসল কবিতা আসেনি।

আমি যে কবিতাগুলো লিখেছি সেই কবিতাগুলো হচ্ছে খাঁটি গ্রামের মানুষকে নিয়ে লেখা। এবং তাদের জীবনযাত্রাকেতো আমরা মিথ্যা বলতে পারছিনা। খাঁটি একদম খাঁটি। তাদের চেহারা, তাদের সংস্কৃতি, তারপর তাদের উপলব্ধি – সেগুলা একেবারে গ্রামের – সেগুলা সুন্দর করে পরিষ্কার ভাবে লিখেছি।

রা.আ: আচ্ছা, আপনার বয়জ্যেষ্ঠ কবিদের মধ্যে কার কবিতা আপনার ভালো লাগত? এই প্রশ্ন এই জন্য করছি যে, আপনার কবিতায় যে একটা স্পষ্টতা আছে তার উৎস খোঁজার জন্য। তো সিনিয়ার কবিদের মধ্যে কার কবিতা আপনার ভালো লাগত?

ও.আ: কারো কবিতাই ভালো লাগত না।

রা.আ: কারোটাই লাগত না?

ও.আ: রবীন্দ্রনাথের কবিতাগুলো, ভাব পরিষ্কার কবিতা। নজরুলের কবিতা পরিষ্কার কবিতা। সেইগুলি আমার ভালো লাগত। আর বিদেশী কবিদের মধ্যে টি এস এলিয়টের কবিতা।

রা.আ: ধরেন, আহসান হাবীবের কবিতা? বা জীবনানন্দের কবিতা?

ও.আ: না। জীবনানন্দ দাশের কিছু কবিতা ভালো লেগেছে। গ্রামের কবিতা। তার একটা কবিতা, বা কাব্যগ্রন্থ একেবারে নজরুল কে অনুসরন করে লেখা। কোন-টা বলেন তো…?

রা.আ: “ঝরা পালক” – এর কথা হয়ত বলছেন আপনি… একেবারে প্রথম গ্রন্থটা।

ও.আ: হ্যা নজরুল কে অনুসরণ করে আসা …

রা.আ: পরের বই থেকেই পরিবর্তন হয়ে গ্যাছে …

ও.আ: পরিবর্তন হয়ে গেল। হ্যাঁ এখান থেকে বোঝা যায় তিনিও কিছুটা বিভ্রান্ত হয়েছেন।

রা.আ: আচ্ছা, আহসান হাবীব সাহেবের কিছু কবিতার সাথে আপনার কবিতার মিল খুঁজে নেওয়া যেতে পারে কিন্তু…

ও.আ: দুই একটা পাওয়া যায়।

রা.আ: কিন্তু আপনি কি বলবেন না যে, উনার কবিতা আপনি পছন্দ করেছেন বা প্রভাবিত হয়েছেন?

ও.আ: না তা বলবনা। সেটা বলবনা। বললে পরে আমি লিখতেই পারতাম না। এই পর্যন্ত আসতেই পারতাম না।

সি.শ: এলিয়টকে আপনার কী কারণে বড় কবি মনে হয়?

ও.আ: এলিয়টের কবিতার এপিসোডের জন্য। এপিসোড মানে, কবিতার মধ্যে গল্প আছে। যেমন [অস্পষ্ট] কে উনি তুলে এনেছেন। তারপর হ্যামলেট কে তুলে নিয়ে এসেছেন।

রা.আ: “Lovesong of J Alfred Prufrok” …?

ও.আ: হ্যাঁ ওইটাই তো ভাল লেগেছে আমার বেশি।

সি.শ: এলিয়টকে কি আপনার মনে হয়নি ট্রেডিশনের দালাল?

ও.আ: নাহ্‌ তা মনে হয়নি। এলিয়টকে অনেকে ভুল বোঝে কিন্তু এলিয়ট কিন্তু অন্যরকম। এলিয়টকে যদি আপনি বুঝতে চান তাহলে দেখবেন যে অনেক সুন্দর উনার এপিসোডগুলো। গল্পের আকারে। বিভিন্ন উপন্যাস থেকে, বিভিন্ন কবিতা থেকে, গল্প থেকে উনি নিয়েছেন উপাদানগুলো।

সি.শ: উনার প্রবন্ধগুলো কেমন লেগেছে?

ও.আ: প্রবন্ধগুলো তো ছোট ছোট। বড় না। 

সি.শ: উনার বিখ্যাত যে প্রবন্ধটা – সেটা তো খুব সেনসেটিভ?  “ট্রেডিশন এ্যান্ড ইন্ডিভিজুয়াল ট্যালেন্ট”?

ও.আ: ওগুলা আমার খুব একটা ভাললাগেনি।

রা.আ: আচ্ছা, এবার একটু অন্য প্রসঙ্গে আসি, আপনাদের সময়ের আগেপরে থেকেই তো ওপাড় বাংলা এপাড় বাংলায় লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলন গড়ে উঠেছে। তার সাথে সাথে ছিল ট্রেডিশনাল মূল ধারার পত্রিকাগুলা। এই প্রসংগে আপনার অভিজ্ঞতা …

ও.আ: লিটল ম্যাগ বলতে ওদের ওখানকার সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ওটা আমার ভালো লাগত। কৃত্তিবাস। আর তা ছাড়া দুই একটা পত্রিকা…পত্রিকাটার নাম যেন কী … কী ভট্টাচার্য যেন …?

সি.শ: সঞ্জয় ভট্টাচার্য …?

ও.আ: সঞ্জয় ভট্টাচার্য ।

রা.আ: এদিককার কোনো লিটল ম্যাগ আপনার নজরে পড়েছে কি?

ও.আ: হ্যাঁ দেখিতো, প্রাইয়ই তো হাতে আসে। বগুড়া থেকে ভাল বের হয় আরকি।

সি.শ: আচ্ছা আপনাকে মনে করায়ে দেই বুদ্ধদেব বসুর কবিতা-

ও.আ: হ্যাঁ হ্যাঁ বুদ্ধদেব বসু তো আমাদের গুরু …

সি.শ: বুদ্ধদেব বসুর কবিতাপত্রটা …

ও.আ: কবিতাপত্র – ওইটাতেই তো শামসুর রাহমান উঠলেন। শামসুর রাহমান কে তুল্লেন তো উনি। শামসুর রাহমান কে তুলে ধরলেন। আর উনি [শামসুর রাহমান]বলেছেন যে জন্মের দাগ যেরকম থাকে … আর শহীদ কাদরীকে আমার তেমন কবি মনে হয়না। তিনি কয়েকটা লেখা লিখেছিলেন আরকি, তারপর তো চলে গেলেন আমেরিকা। আমেরিকা গিয়ে আর লেখেন নাই।

রা.আ: কিন্তু তিনি যে তিনটা বই করে গিয়েছিলেন সেগুলা তো যথেষ্ট –

ও.আ: তা হোক। কিন্তু তারপরে তো আর লেখেন নাই। উনার যে বইগুলা আরকি সেখানকার কবিতাগুলা, মানে, কতগুলা অর্ধেক অর্ধেক ভাবে করা

রা.আ: মানে কবিতাগুলার কথা বলছেন কি? এই অসম্পুর্ণতা …

ও.আ: হ্যাঁ মানে ওইধরণের একটা পরিপূর্ণ স্মৃতি বা আইডিয়া প্রকাশ করেননাই।আর উনার কবিতাগুলা বিশেষ করে রিডিকুলাস। রিডিকুলাস।

রা.আ: আপনার এই মন্তব্য প্রসঙ্গে আমার একটা কথা মনে পড়ছে আরকি, জীবনানন্দ দাশ একবার একটা প্রবন্ধে E.E.Cummings সম্পর্কে বলেছিলেন যে উনার কবিতা তাঁর একেবারেই ভালো লাগেনাই। Cummings এর কবিতাগুলা নাকি চাটুকারিতায় ভরা… এক ধরণের স্টান্টবাজি … অথচ এই কামিংস তো ওই একই সময় বা পরবর্তীতে খুবই বিখ্যাত একজন কবি হিসাবে স্বীকৃত …

ও.আ: হ্যাঁ।

রা.আ: অন্যদিকে শহীদ কাদরী আবার একটা সাক্ষাৎকারে অনেকটা এই ধরণের কথা বলছিলেন যে বিনয় মজুমদারের কবিতা উনার কাছে ততটা মানোত্তীর্ণ নয়। কারণ, শহীদ কাদরীর মতে, কবিতায় থাকতে হবে নানা ডাইমেনসন। ইতিহাস যেমন থাকবে, পলিটিক্স, বিজ্ঞান, অধুনা বিশ্বের খবরাখবর … নানা রকম ইনপুট থাকবে … এই সব…

ও.আ: এটা অবশ্যই থাকবে। ইতিহাস, পলিটিক্স, মিথ। আমার অধিকাংশ কবিতায় মিথ ভরা। ছোট একটা সনেট লিখি – তার মধ্যেও রয়েছে। তবে, শহীদ কাদরী সম্পর্কে যেরকম বললাম …সেটা মানে আমরা যেমন এখন পর্যন্ত লিখে যাচ্ছি… তেতাল্লিশ খানা বই বেরিয়েছে … আচ্ছা, বই শুধু বের হলেই যে সে ভালো কবি হলো তা না …তবু তার লেগে থাকতে হবে। রবীন্দ্রনাথ যেমন দশ বছর বয়সে লেখা শুরু করেছে আমিও ওরকম দশ বছর বয়স থেকে শুরু করেছি লেখা। আমার অন্তত আটান্ন, ষাট বছর হয়ে গেছে লেখার বয়স। এবং আমি নিষ্ঠাবান লেখার ব্যাপারে। নিষ্ঠাবান।

রা.আ: কবিতা ধারাটাই আপনার প্রিয়? বাংলা গল্প, উপন্যাস, গদ্য এসবের তুলনায়?

ও.আ: যেমন আমি বাংলা সাহিত্যে এম এ পাশ করেছি কিন্তু ওগুলোর আমি ধার ধারিনি। আমার ইংরেজীতেই বেশি ইয়ে। পান্ডিত্যের দিক দিয়ে  ওসব আমি প্রচার করতে চাইনে।

রা.আ: আপনি আপনার লেখায় বেশিরভাগই তা’লে ইংরেজী সাহিত্য থেকেই গ্রহণ করেছেন?

ও.আ: বাংলা সাহিত্য থেকেও করেছি। দুই ভাষা থেকেই। এবং আমার যেটা মনে হয়, কবিতার যে গঠন, সনেট, এই সনেটের যায়গায় আমি সুন্দর ভাবে কাজ করে গিয়েছি। আমার অধিকাংশই সনেটে লেখা। আবার সনেটেও আমি একবার ১৪-র যায়গায় ১৫ লাইন করে দিয়েছি।

রা.আ: হ্যাঁ এরকম স্বাধীনতাও কেউ কেউ নিয়ে থাকেন। তবে সনেটের প্রতি আপনার এত আগ্রহের কারণ কী?

ও.আ: ছন্দ ঠিক মনে হয় আমার কাছে। আর কবিতাটা ব্যার্থ হয়ে গেল – এটা মনে হয়না। মিথ থাকে, ছন্দ থাকে – সেই জন্যে মনে হয় কবিতাটা সার্থক হয়েছে। আমার সাম্প্রতিক যেসব কবিতা আছে – সেখানে সনেট-ই বেশি।

সি.শ: আচ্ছা এখনকার, এই সময়কার কবিতা সম্পর্কে আপনার ধারণা কী।

ও.আ: এখনকার পত্র পত্রিকায় লেখা যে হচ্ছে এগুলা খুব, মানে, দিশেহারা।

সি.শ: এখনকার সময় দিশেহারা, নাকি কবিতা দিশেহারা?

ও.আ: কবিতাই দিশেহারা। কেমন করে? কবিতায় যেটা থাকা দরকার – টিকে থাকা – টিকে থাকার মত তারা ঠিক মত লিখতে পারেনা।… দেশ পত্রিকায় একটা কবিতা দেখলাম। প্রথম দুই লাইনে মিল দিয়েছে। দুই লাইনে মিল দিয়ে তারপর চার লাইন চার লাইনে করে বারো লাইনে মিল দিয়েছে। এটা আমার কাছে একটু আশ্চর্যজনক মনে হয়েছে। তো আমি মনে করলাম যে এরকম লিখব কিনা। না না আমি এরকম লিখব না। এরকম লেখা সঠিক না।

রা.আ: বাংলাদেশে আপনাদের সময়ের পরে যারা কবিতা লিখতে এসেছেন তাদের লেখা সম্পর্কে আপনার কী ধারণা?

ও.আ: পরবর্তী কবিরা যদি আমাদের অনুসরণ না করে তাহলে তো তারা আলাদা হয়ে যাবে।

রা.আ: ধারার একটা বিচ্যুতি ঘটেছে – এরকম বলতে চাচ্ছেন আপনি?

ও.আ: হ্যাঁ। হ্যাঁ।

সি.শ: কেন বিচ্যুতি ঘটল বলে মনে করেন আপনি?

ও.আ: এটা কবিদের মানসিকতা। বর্তমানকালের যে মানসিকতা তার কারণেই এরকম ঘটেছে।

সি.শ: কারনগুলো কী?

ও.আ: কারণগুলোর মধ্যে যেমন ধরেন পলিটিকাল কারণ থাকতে পারে। অর্থনৈতিক…

সি.শ: আচ্ছা আপনারা যারা আমাদের পূর্বসুরী – আপনার কি মনে হয় আপনাদের নেতৃত্ব সঠিক ছিল? তাদের কোন ভুল ছিল কিনা নেতৃত্বে?

ও.আ: তাদের নেতৃত্ব বেশি পরিপক্কতা পায়নি।

রা.আ: আচ্ছা , একটু আগে আপনি একটা মজার ইস্যু বলছিলেন যে পরবর্তী প্রজন্মের বিচ্যুতির পিছনে অর্থনৈতিক একটা কারণ থাকতে পারে। এই অর্থনৈতিক বিষয়টাকে কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন আপনি?

ও.আ: টিকে থাকার ব্যাপারে বলছিলাম । যেমন তারা টিকে থাকতে পারছেনা। তখন তাদের মনের মধ্যে অন্যরকম হয়ে যাচ্ছে।

রা.আ: তাহলে সেই সময় আপনারা কিভাবে টিকে থাকতেন? আপনাদের সময় আপনাদের পেছনে কি একটা গ্রামীয় অর্থনীতির ভিত্তি বা সাপোর্ট কাজ করেছিল? যা কিনা পরবর্তী নাগরিক প্রজন্ম ততখানি পায়নি?

ও.আ: আমাদের এই শামসুর রাহমানের কথাই ধরেন। শামসুর রাহমান যখন লিখতেন আরকি তখন উনাকে নাগরিক কবি হিসেবে ধরা হয়। কয়েকদিন  পরে উনি চলে আসলেন গ্রামের দিকে। আমরা যেমন লিখছি – সেইরকম লেখার চেষ্টা করলেন। এইটা কি সস্তা জনপ্রিয়তার জন্যে নাকি অন্য কোনো কারণে আমি জানিনা।

রা.আ: তারপরেও উনার কবিতায় তো খুব সুন্দর কিছু বৈশিষ্ট্য আছে …

ও.আ: আছে। অনেক কবিতাই উনার ভালো কবিতা আছে। কিন্তু ঢালাও ভাবে সব কবিতা হয়নাই। অনেকে তো উনার অনেক কবিতাকে কবিতা বলেই মনে করেননা।

সি.শ: গঠনগত দিক দিয়ে উনার অনেক কবিতাই তো দূর্বল। যেমন ধরেন “স্বাধীনতা তুমি”।

ও.আ: হ্যাঁ হ্যাঁ ওই কবিতাটা, হ্যা ঠিকটা ধরেছেন আপনি।

সি.শ:  এই কবিতার চেয়ে সহজ …

ও.আ: হ্যাঁ ওই কবিতাটা পড়ে দেখেছি।

সি.শ:  এই কবিতাটা একটা পদ্য হতে পারে।

ও.আ: কবিতা না ওটা। আমার প্রথমে মনে হয়েছিল কী – ওই কবিতার যতটুকু পাঠ্য পুস্তকে আছে সেটাই মূল কবিতা … পরবর্তীতে দেখি … 

সি.শ:  কোনো ক্রিটিকাল আইডিয়া নেই … এক-রৈখিক অর্থ থাকলে তো… আচ্ছা মাহাবুবুল আলমের পুরস্কার না পাওয়ার ব্যাপারে আপনার কোনো মূল্যায়ন আছে? উনিও তো স্বাধীনতা নিয়ে অনেক কবিতা লিখেছেন।

ও.আ: পুরস্কারের ব্যাপার তো অন্য জিনিস।পুরস্কার তো আমিও পাইনি। তাই বলে কি আমি কবি নই? ওই একাশি সনে বাংলা একাডেমি পুরস্কার দিয়েছিল – ওইটাই শেষ।

রা.আ: কবি নির্মলেন্দু গুণের কবিতার মূল্যায়ন…?

ও.আ: উনার, মানে নির্মলেন্দু গুণের কবিতা হলো তাৎক্ষণিক। মানে, দেখা এবং ওইখানেই দেখা। 

সি.শ: আচ্ছা, আপনি কি কখনো শহীদ কাদরী এবং নির্মলেন্দু গুণের কবিতার মধ্যে মিল পেয়েছেন?

ও.আ: না, না, না। শহীদ কাদরীর কবিতা অনেক অন্যরকম। শহীদ কাদরীর কবিতা আর গুণের কবিতার মধ্যে তফাৎ আছে।

সি.শ: কিন্তু এই দুই কবির মধ্যে তো অনেক সখ্যতা ছিল।

ও.আ: সখ্যতা ছিল কিন্তু তার মধ্যে অনেক কবিতা বাছাই করতে গ্যালে বাদ হয়ে যাবে। সেগুলা আরকি হালকার উপরে লিখছেন উনি।

সি.শ: জনপ্রিয় ধারার কবি …

ও.আ: জনপ্রিয় কবি। আওয়ামী লীগের দলে এসেছেন। এই কথাটাই বললাম আরকি, আওয়ামী লীগ কথাটা বললাম। সাপোর্ট করি আর না করি। আমি, মানে, এখানে বলছি যে, এখন তো আর মুসলিম লীগ নাই কিন্তু এক সময় তার খুব দাপট ছিল। শেষ হয়ে গ্যাছে। অন্য একসময় আসবে যখন এই কোনো দলই থাকবেনা।

রা.আ: আচ্ছা, উনাদের পরের দিককার পর্যায়, যেমন ধরেন সত্তর এর দশকে যারা লেখালেখি করেছে বা আশির দশকে, বাংলাদেশে বিশেষ করে, তাদের মধ্যে কোনো বৈশিষ্ট্য কি আপনার চোখে পড়েছে বা কারো কবিতা ভালো লেগেছে?

ও.আ: নাহ্‌। তেমন আর পাইনি। সত্যি কথা বলতে আরকি। আমরা যেভাবে সিনসিয়ারলি চেষ্টা করেছিলাম … আমরা প্রথমে ছিলাম কিন্তু প্রত্যেকের সাথে লিঙ্ক্‌ড। বলতে পারি যেমন নরেশ গুহ, তারপরে মঙ্গলাচরণ চট্টোপাধ্যায় এরকম সব লোকজন যাঁরা – ওদের কবিতাগুলো পরিশ্রম করে লেখা। শামসুর রাহমান সম্বন্ধে একটা চিঠি ছিল আমার কাছে – আমার বাড়ি পুড়ায়ে দিয়েছে ৭১ সনে। আমার অনেক কিছু পুড়ে গেছে। প্রকাশিত লেখা পুড়ে গেছে, অপ্রকাশিত লেখা পুড়ে গেছে। তো সেইটা এখন থাকলে পরে আমি বলতাম যে শামসুর রাহমান সম্পর্কে নরেশ গুহ কী বলেছেন, আর আমি আল মাহমুদ কে কী বলেছিলাম। তো সেই লেখাগুলা সব পুড়ে গেছে। এইগুলা থাকলে দেখাতে পারতাম আরকি।

রা.আ: শামসুর রাহমান বা আল মাহমুদ সম্পর্কে নরেশ গুহ-র মূল্যায়ন কী ছিল?

ও.আ: আচ্ছা, নরেশ গুহ বয়সে কিন্তু আমাদের থেকে অনেক বড় আরকি। আমাদেরকে যে সবক দিয়েছিলেন তা আমরা পুরাপুরি পালন করার চেষ্টা করেছিলাম।  কবিতা কিভাবে হবে, কিরকম ভাবে নতুন কবিতা হবে, সে ধরনের কথা আমরা অনুসরণ করার চেষ্টা করেছিলাম।

রা.আ: কিভাবে উনাদের সাথে আপনাদের যোগাযোগ হত?

ও.আ: চিঠিপত্রের মাধ্যমে। আমি তখন সংবাদে চাকুরী করতাম। দৈনিক সংবাদে। তখন যেহেতু আমার একটা লিঙ্ক ছিল, দেশ পত্রিকায় আমার লেখা ছাপা হত। প্রচুর পরিমানে। তারপরে ইয়ে হুমায়ুন কবীরের কী পত্রিকা ছিল ওইটা? চতুরঙ্গ। চতুরঙ্গ পত্রিকায় বহু লেখা দিতাম। এই সেদিনকার থেকে আর লিখিনা। তখন আমরা লিখতাম মানে, যাতে ভবিষ্যতে তা যেন বাদ পড়ে না যায়। যেন ভবিষ্যতে টিকে যায়। অনুশীলনের উপর খুব জোড় দিতাম আমরা।

সি.শ: অনুশীলন যূগ নিয়ে কিছু বলেন।

ও.আ: ওই আমরা কবিতা নিয়ে ভাবতাম। একটা কবিতাকে অন্তত তিন দিন ধরে আমি লিখেছিলাম। লিখে ছিড়ে ফেলেছিলাম। সেই সময় কলেজ চালু থাকত। ভেড়ামারা কলেজ। ভেড়ামারা কলেজে যেতাম, আবার এসে বিছানায় বসে কবিতা লিখতাম। এইভাবে তিনদিন পরে দেখি যে কবিতাটা, এই কাটাকুটি কাটাকুটি শেষে আর মনঃপুত হলোনা। ছিঁড়ে ফেলে দিলাম। এটার কারণ হলো কি যে, কবিতা আমরা লিখেছি, মানে, অনুশীলন ছিল সে সময়। রবীন্দ্রনাথ যেমন কবিতা কাটাকুটি করে ছবি এঁকে ফেলত – সেটা আমার কাছে ভাল লাগত আরকি। আর এখনকার কবিতা হচ্ছে কি যে আপনি কবিতা শেষ না হতেই টেলিফোন পেলেন আরকি। তারপরে কথা শেষ করে আবার লেখা।

সি.শ: মানে আপনি অভিনিবেশ নিয়ে প্রশ্ন করবেন – মানে এদের অভিনিবেশ নেই – এটা মনে হয় আপনার?

ও.আ: হ্যাঁ। এইটা। তার ফলে হচ্ছে কি, অনেক অ-কবির কবিতা ছাপা হয়ে যাচ্ছে।

রা.আ: আচ্ছা অনেকে যে বলেন, একটা ইন্সপায়ারেশন থেকে কবিতা লেখা হয়ে যায় – তো সেরকম কবিতাও তো খুব ভালো ভাবে লেখা হচ্ছে, বা ভালো বলে সমাদৃত হচ্ছে …

ও.আ: খুব কম হচ্ছে সেরকম। সেটা বলা যায় শতকরা ৫ ভাগ।

রা.আ: আচ্ছা ৭০ এ যে লিখতেন আবিদ আজাদ। তো উনার লেখা …

ও.আ: উনি আমাদের চেয়ে জুনিয়ার… আবিদ আজাদের লেখা … “ঘাসের ঘটনা” একটা বই বেরিয়েছে। ঘাসের ঘটনা …

রা.আ: জ্বি আর শিল্পতরু প্রেস করতেন…”কবি” নামে একটা পত্রিকা চালাতেন…

ও.আ: …তো সেই বইটাতে কিছুটা স্ফুটন দেখা গেছিল। কিন্তু পরিপক্কতা আসেনি। শামসুর রাহমানের অনুকরণে লিখতেন বা কলকাতার অনুকরণে হতে পারে… তো লেখাগুলায় পরিপক্কতা আসেনি। যে সময় পরিপক্কতা আসবে ঠিক সেই সময় মারা গেলেন। খুব অল্প বয়সে মারা গেছেন। আর রেডিওতে চাকুরি করে করে উনার প্রতিভাটাকে তিনি নষ্ট করে ফেললেন।

রা.আ: রেডিও বলতে মনে পড়ল মুস্তফা আনোয়ার সাহেব …

ও.আ: মুস্তফা আনোয়ার মানে, স্বল্প পরিচিত। কিন্তু সাহিত্যের মধ্যে আবিদ আজাদ বেশ পরিচিত।

রা.আ: আচ্ছা আমরা জানতাম যে বেশ কিছু বিদেশী, বিশেষ করে ব্রিটিশ কবিদের সাথে আপনার সখ্যতা বা যোগাযোগ ছিল …

ও.আ: নাহ্‌। আমার তেমন কিছু ছিলনা। তবে ছাপা হয়েছে আরকি। ইংরেজিতে অনুবাদ হয়েছে আমার লেখা।

রা.আ: ইংরেজীতে, সেগুলা কি বাংলাদেশে প্রকাশিত নাকি বিদেশে …?

ও.আ: বিদেশে। 

রা.আ: কোথায়?

ও.আ: লন্ডন থেকে বেরিয়েছে তারপর অন্য যায়গা থেকে বেরিয়েছে।

রা.আ: সেগুলাকি বিচ্ছিন্ন ভাবে নাকি বই আকারে?

ও.আ: নাহ। বিভিন্ন কবিতা…

[“একদিন একটি লোক” কবিতা নিয়ে আলোচনা শুরু। কবিতাটা অস্পষ্ট। ঘর থেকে উঠানে চলে এলাম আমরা।]

রা.আ: আচ্ছা আমাকে একজন বললেন যে, আপনি যখন ঢাকায় ছিলেন, মানে সংবাদে, আপনাকে একজন সাজেশন দিলেন যে আপনি যেন গ্রামে চলে যান, পড়াশুনা করে আবার ঢাকায় ফেরৎ আসেন … ? 

ও.আ: নাহ, ওসব বলে কাজ হবেনা। আমার যা করার আমি নিজেই করেছি।

রা.আ: হঠাৎ করে শহর থেকে চলে আসলেন কেন ?

ও.আ: চলে এসেছি মানে, শহরে সংবাদ মাধ্যমগুলো সরকারী টারগেটে পড়ে গেল আরকি। রোষানলে পড়ে গেল। তারপরে মানে ওইখান থেকে পালায়ে আসলাম। আর ফিরে যাইনি।

রা.আ: এটা কোন সময়?

ও.আ: এটা হলো ১৯৬০ সনে …ওখানে রণেশ দাশগুপ্ত গ্রেফতার হলেন, তারপর আরো অনেকে গ্রেফতার হলেন, তারা ওখানে, মানে সংবাদের স্টাফের মধ্যে প্রায় অর্ধেকই গ্রেফতার হলেন। আর একদিন ওই পত্রিকা সেনসর করা হল। এরকম দুই-তিন দিন দেখলাম, দেখে ওইখান থেকে আমরা চলে আসলাম।

সি.শ: যুদ্ধে যান নি কেন?

ও.আ: যুদ্ধে যে যাইনি, ছেলেপুলে ছিল ছোট ছোট। ছোট ছেলেপুলে। আর আমার তখন অবস্থা তেমন ভালো ছিলনা। তখন আমি গেলামনা।

(রাদ আহমদ সম্পাদিত ‘বৈঠকখানা’ পত্রিকার প্রথম সংখ্যা (২০১২)থেকে পুনঃমুদ্রিত)

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s