হৃদয় – ব্রায়ান ডয়েল

ভাষান্তর করেছেন আমিন আল রাজী


আমি চাই কিছুক্ষণের জন্য আপনি একটু হামিংবার্ডের কথা ভাবুন। একটা হামিংবার্ড, তার হৃদয় সেকেন্ডে দশবার স্পন্দিত হয়। ওর হৃদয়ের আকার পেন্সিলের গোঁড়ায় থাকা ইরেজারের সমান। বলা যায়, একটা হামিংবার্ডের অনেকটাই হচ্ছে হামিংবার্ডের হৃদয়টা। শ্বেতাঙ্গ অভিযাত্রীরা যখন অ্যামেরিকাতে এসে প্রথম হামিংবার্ড দেখে তারা তখন এর নাম দিয়েছিল Joyas voladoras, উড়ন্ত রত্ন বা ফ্লাইং জুয়েল। শ্বেতাঙ্গরা এমন সৃষ্টি আগে দেখেনি। কারণ হামিংবার্ড পৃথিবীতে কেবল অ্যামেরিকাতেই দেখা যেত, অন্য কোথাও না। সেখানে শত শত জাতের হামিংবার্ড গুঞ্জন তুলে ছুটে যায়, ফুলে ফুলে মধু খেয়ে বেড়ায়। মানুষ যদি তাদের এই দৈত্যাকার কান ঐ অতিক্ষুদ্র বুকে পেতে শুনতে পারত, তবে দেখত তার স্পষ্ট শোনার ক্ষমতার চেয়েও হামিংবার্ডের হৃৎস্পন্দন কত দ্রুত ছোটে। 

ক্রিস্টোভাল, টেক্সাস-এর হামার হাউজে এক কালো-চোয়াল হামিংবার্ড; ফটো: হোমান্দো ক্রুয
সূত্র: https://gardenandgun.com/articles/solving-the-mystery-of-hummingbirds/

এক দিনে হামিংবার্ড হাজারও ফুলের কাছে যায়। উড়তে পারে ষাট মাইল বেগে। এরা কিন্তু উল্টো মানে পিছনেও উড়তে পারে, আর একটুও না থেমে উড়তে পারে পাঁচশ মাইল পর্যন্ত। তবে যখন বিশ্রামে আসে, হামিংবার্ডেরা যেন মৃত্যুর কাকাকাছি চলে আসে – হিমশীতল রাতে অথবা অভুক্ত অবস্থায় ওদের শরীর নির্জীব হতে থাকে। মেটাবলিজমের হার নেমে যায় স্বাভাবিক ঘুমন্ত অবস্থায় যা থাকার কথা, তার পনের ভাগের একভাগে। হৃদয় যেন প্রায় থেমেই যাবে, বন্ধ হবে যাবতীয় স্পন্দন। এসময় তাদের যদি উষ্ণতা দেওয়া না হয়, যদি ঠোঁটের কাছে এমন কিছু না রাখা হয় যার স্বাদ মিষ্টি, তবে তাদের হৃদয় ঠাণ্ডা হতে হতে একসময় স্তব্ধ হয়ে যায়। একবার ভাবেন, আজকের দিনে অ্যামেরিকায় কত হামিংবার্ড চোখ খোলেনি, দাড়িয়ালা হেলমেট ক্রেস্ট, বুটেড র‍্যাকেট টেইলস, বেগুনি লেজের সিলফস, বেগুনি টুপির উডলিম্পস, ক্রিমসন পোখরাজ আর বেগুনি মুকুটের পরী, লাললেঞ্জা ধুমকেতু আর পদ্মনীলা উডস্টার, রঙধনু-দাড়িয়াল থর্নবিল, ঝলমলে পেটের পান্না, বেগুনি মখমলের করোনেট, সোনালী পেটের স্টার ফ্রন্টলেটস, আগুন লেজের অলবিলস এবং আন্দিয়ান হিলস্টার, স্প্যাচুলিটেইলস আর পাফলেগস। এদের প্রত্যেকে এত অপূর্ব, না দেখলে বিশ্বাস হতে চায় না! নবজাতকের নখের সমান বড় অথচ দোর্দণ্ড শক্তির পাগলাটে সেই হামিংবার্ডের হৃদয়গুলি এখন নিশ্চুপ, সেই অনবদ্য বাদ্য চিরতরে থেমে গেছে।


অন্য সব উড়তে পারা পাখির মত হামিংবার্ডেরও মেটাবলিজম খুব শক্তিশালী। এই মেটাবলিজম চালাতে তাদের হৃদয়কে ছোটাতে হয় রেসিং গাড়ির গতিতে আর সেই হৃদয়  পাগলের মতো অক্সিজেন গিলতে থাকে। হামিংবার্ডের হৃদয়ের পেশি আমাদেরটার চেয়েও চিকন আর পাতলা, কিন্তু ধমনীগুলো অনেক মজবুত, পোক্ত। ওদের হৃদয়ের পেশিতে মাইটোকন্ড্রিয়ার সংখ্যাও অনেক বেশি থাকে, যাতে আরও বেশি করে অক্সিজেন নেওয়া যায়। আর হৃদয়টা থাকে চামড়ার সাথে লাগানো। তাই মাধ্যাকর্ষণ বা জড়তা, খাবারের জন্য উন্মত্ত ছোটাছুটি কিংবা অন্য পাখির সাথে লড়াইয়ের মত বিতিকিচ্ছিরি অবস্থাতেও দিব্যি অটুট থাকে। তবে এই উচ্চাকাঙ্ক্ষী জীবনের মূল্য তাদের দিতে হয় মৃত্যুর খুব কাছাকাছি থেকে। পৃথিবীর যে কোন প্রাণীর চেয়ে হামিংবার্ডের হার্ট অ্যাটাক, এনিউরিসম, কিংবা হার্ট বিকল হওয়ার ঘটনা অনেক বেশি হয়। আসলে আকাশে ওড়া খুব ব্যয়বহুল একটা বিষয়। ওড়ার সময় শরীরের প্রচণ্ড বার্ন আউট ঘটে, দেহযন্ত্রটা পুড়তে থাকে, ভেতরের ইঞ্জিন গলে যেতে থাকে। পৃথিবীতে বেঁচে থাকা সব প্রাণী নিজেদের আয়ুষ্কালে খরচ করার জন্য মাত্র দুই বিলিয়ন হার্টবিট পায়। আপনি সেটা কাছিমের মত ধীরে ধীরে কাটাতে পারেন দুইশ বছর ধরে, অথবা হামিংবার্ডের মত নিমিষেই শেষ করতে পারেন মাত্র দুই বছরে। 


প্রাণীদের মধ্যে সবচেয়ে বিশাল হৃদয়টা নীল তিমির। ওজনে সাত টনের বেশি হবে, যেন একটা ঘরের মত, যার ভেতরে আবার চারটা চেম্বার আছে। একটা মানবশিশু ভেতরে হেঁটে বেড়াতে পারবে, মাথা সোজা রেখেই, শুধু হার্টের ভাল্বগুলো পার করতে হলে একটু ঝুঁকতে হবে। আর ভাল্বগুলোও বিশাল, সেলুনের সুইঙ্গিং দরজার মতো। ঘরের সমান এই হৃদয়টা শত ফুট লম্বা একটা প্রাণীকে বয়ে নিয়ে যায়। যখন নীল তিমি জন্মায় এর আকার থাকে বিশ ফুট আর ওজন চার টন। মানে, আপনার প্রাইভেট কারের চেয়েও বড়। প্রতিদিন শিশু নীলতিমি তার মায়ের ওলান থেকে গ্যালন শতেক দুধ খায় আর দুইশ পাউন্ড করে ওজনে বাড়ে। বয়স যখন তার সাত কিংবা আট, তখন তার এমন এক অকল্পনীয় বয়ঃসন্ধি শুরু হয় যখন প্রয়োজনের খাতিরেই সে নির্জনতায় হারিয়ে যায়। এরপর সে কোথায় ঘুরে বেড়ায়, কী তার সামাজিক জীবন, কী তার যৌনকলা, কী রোগ, কোন ভাষা, কোন দেবতা, কোন গল্প, কী দুঃখ আর কোন শিল্পকলা যে সে করে, তা বলতে গেলে আমরা কিছু জানিনা। হয়তো পৃথিবীর মহাসাগরগুলোতে দশ হাজার নীল তিমি আছে কিন্তু পৃথিবীর সবচেয়ে বড় এই প্রাণীকে নিয়ে আমাদের জ্ঞান বেশ সীমিত। তবে এটা জানি, পৃথিবীর বৃহত্তম হৃদয়ের এই প্রাণী যখন ঘুরতে বের হয়, তখন তারা জোড়ায় জোড়ায় থাকে। ওদের রমণের তীব্র শীৎকার, কামনাতপ্ত রসনার আকুল আওয়াজ সাগরতলে, মাইলের পর মাইল ধ্বনিত হয় ।   


স্তন্যপায়ী আর পাখিদের হৃদয়ে থাকে চারটি চেম্বার। সরীসৃপ আর কাছিমের থাকে তিনটি করে। মাছেদের হৃদয়ে চেম্বার দুইটা, পতঙ্গ আর মলাস্ক গোত্রীয়দের হৃদয় এক চেম্বার বিশিষ্ট। কেঁচোরও এক চেম্বারের হৃদয়, ক্ষেত্রবিশেষে অবশ্য তাদের হৃদয়ের সংখ্যা এগারটাও হতে পারে। এককোষী ব্যাকটেরিয়ার আবার কোন হৃদয় নেই, তবে তাদের ভেতরেও গতিশীল তরল আছে। এ তরল চিরগতিময়, কোষের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে প্রবাহিত হচ্ছে, ছুটছে। অভ্যন্তরীণ প্রবহমান তরল ব্যতীত কোন প্রাণী নেই। আমরা সবাই ভেতরে ভেতরে পাক খেয়ে চলেছি।


এক জীবনে হৃদয় কত কিছু ধরে রাখে। কতটা জমিয়ে রাখে এক দিনে, এক ঘণ্টায়, এক মুহূর্তে! আমরা কারও কাছেই হৃদয়টা পুরোপুরি খুলতে পারি না – না মা, না বাবা, না স্ত্রী, না স্বামী, না প্রেমিকা, না সন্তান, না বন্ধু। আমরা সবার জন্য বাতায়ন খুলে রাখি, তবে নিজেদের হৃদয়ের ঘরে আমাদের একাকী বসবাস। হয়তো এমন হওয়াটাই ঠিক। হয়তো আমরা নিজেদের হৃদয়কে এতটা প্রকাশ্যে আনতে পারি না কারণ তাতে হৃদয়ের প্রতিনিয়ত বিক্ষত হওয়ার ভয় থাকে। যখন বয়স কম ছিল তখন আমরা ভাবতাম, কোনো একজন এসে আমাদের বাঁচাবে আর সেভাবেই আমরা চিরদিন বেঁচে থাকবো। তারপর যখন বয়স বাড়তে থাকলো, আমরা জানলাম ওটা নিছক শিশুতোষ এক স্বপ্ন। আমরা জানলাম সব হৃদয়েই ক্ষত হয়, ছিঁড়ে যায়, দাগ বসে। সময় আর ইচ্ছায় সেটা ঠিকও হয়, মনের দৃঢ়তায় সেটা জোড়াও লাগে। তবু হৃদয় সব সময়ই বড় নাজুক, বড় ভঙ্গুর থাকে – সর্বশক্তি দিয়ে একে যতই ধরে রাখেন না, যতই আড়াল করতে পাথরের কঠিন দেয়াল তোলেন। হয়তো আপনি হৃদয়কে এত শক্ত, এত দুর্ভেদ্য, এত শীতল নিস্তরঙ্গ করে রাখলেন, আর তারপরেই একটি মুহূর্ত এসে সব দেয়াল ভেঙে নিশ্চিহ্ন করে দিলো – কখনো কোন নারীর দ্বিতীয়বার ফিরে তাকানো, কখনো কোন নবজাতকের নিঃশ্বাস থেকে আসা আপেলের মত সুঘ্রাণ, হয়তো রাস্তায় ঝনঝন করে পড়ে যাওয়া ভাঙা কাঁচের শব্দ, কারও বুলিতে “তোমার সাথে কথা আছে”, একটা পাঁজরভাঙা বেড়াল যে মরে যাওয়ার জন্য নিজেকে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে অন্ধকার বনের দিকে, আপনার চুলে প্রাচীন কাগজের মত খসখসে হাত দিয়ে আম্মার বিলি কেটে দেওয়া, কিংবা আব্বার স্মৃতি – কোন এক ছুটির দিন সকালে নাস্তার টেবিলে আপনাকে গলা তুলে ডাকছেন।


ব্রায়ান ডয়েল (১৯৫৬-২০১৭) – মার্কিন লেখক; গপ্পো, কাব্য ও প্রবন্ধ লিখেছেন।

আমিন আল রাজী
লেখক, পিতা, কণ্ঠাভিনেতা ও সরকারী চাকরিজীবী। ঢাকায় বসবাস।

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান