রন প্যাজেট, ১১ :: অনুবাদ – পার্থিব মাহমুদ  

[ প্রথমে পেয়েছিলাম প্যাটারসন, জিম জারমুশের প্যাটারসন। ভালো তো লাগলই, না লেগে যাবে কই? দেখলাম একবার, দুইবার, কয়েকবার। অনেকবারই দেখি। ওখান থেকে স্বাভাবিক গতিপ্রকৃতিতেই পাওয়া রন প্যাজেটকে। প্যাটারসনে যে কয়টা আছে কবিতা, এর বাইরে সর্বপ্রথম কোনটা পড়ছিলাম মনে পড়ে না। তবে প্যাজেটের প্রতি আগ্রহের শুরু ওহায়ো ব্লু টিপ ম্যাচবাক্স নিয়ে লেখা কবিতাটাই।

এনজিওর প্যানপ্যানানি গ্রুপ ডিসকাশন আর কড়কড়ে আইনকানুন অনুবাদ করে হাত পাকানো কাঁচা হাতে একদিন প্রচুর ভুলভালসমেত প্রথম অনুবাদ করে বসলাম দ্য লেডি। অনুবাদের বেলায় সেটা ছিলো পা ভিজানোর মত, কারণ সেটা রন প্যাজেটের লেখা না। গিয়ম এপোলিনেয়ারের লেখা, রন প্যাজেটের অনুবাদ। অনুবাদের অনুবাদ দিয়ে শুরু করা। রেইনকোটের উপর আরেক রেইনকোট চাপিয়ে গোসল। কিন্তু করতে ভালোটা লেগেছিলো খুবই, সেটা অস্বীকার করতে পারবো না। এরপর টিকিং এন্ড টকিং, রন প্যাজেটেরই। তখন থেকে কাজ না থাকলে খই ভাজার বদলে শুরু হলো প্রতিদিন প্যাজেটের নতুন কোন একটা পড়া, আর অনুবাদ করতে করতে নিজের ভিতর নাড়াচাড়া করা। সুনীলের ‘ছবির দেশে, কবিতার দেশে’ অনেকবার পড়া ছিল – যার কারণে উনিশ শতকের ফ্রান্স দেশের স্যুররিয়ালিস্ট লেখক আর শিল্পীদের সাথে পুরান একটা আত্মীয়তার মতো সম্পর্ক তো ছিলই; তাদের বহুদূরে, এক শতাব্দী আর দুইটা বিশ্বযুদ্ধ পরের সময়ে আটলান্টিকের অন্য পারে তাদেরই গোত্রভুক্ত নিউইয়র্ক ঘরানার একজন অতি অমায়িক কবির টানে পড়ে যাওয়াটা তাই এখন অনুমিতই লাগে। যদিও সেটা পরের ব্যাপার। তবে প্যাজেটের কবিতায় ঘুরেফিরে তাদের আসাটারও একটা ভূমিকা ছিল প্যাজেটের লেখার প্রতি টান তৈরিতে।

জীবনে অনেক শখ একদিন ফ্রাঙ্ক ও’হারা অনুবাদ করবো।

– অনুবাদক ]

জিম জারমুশ নির্মিত প্যাটারসন (Paterson, 2016) সিনেমার পোস্টার


লাভ কুক

তোমার জন্য কিছু খাবার রেঁধে দিচ্ছি।
তুমি বসো, আর তোমার জুতা
আর মোজাটা খুলে ফেলো, আচ্ছা বাকি
কাপড়চোপড়গুলোও, একটু দাকিরি খাও,
একটা গান ছাড়ো, আর নাচো
ঘরজুড়ে, ভিতরে আর বাইরে।
রাত হয়ে গেছে, আশপাশের
সবাই ঘুম, ওই গবেটগুলো, আর
তারারা চমৎকার জ্বলছে,
আর আমি চুলা ধরিয়েছি
তোমার জন্যে, ক্ষিদে লেগেছে বেচারাটার।


মৃত্যুহীন পাখির মতো কবি

এইমাত্র আমার হৃদপিণ্ডটা ধক করে উঠলো
আর আমার মনে হলো, “হার্ট অ্যাটাকে মারা যাওয়ার জন্যে
এটা খুবই খারাপ একটা সময়, একটা
কবিতার মাঝখানে,” তারপর খুব আরাম হলো
এটা ভেবে যে আমার জানামতে কেউ
একটা কবিতা লেখার মাঝখানে কখনো
মারা যায় নি, ঠিক যেমন পাখিরা কখনো মরে না মাঝআকাশে।
আমার যা মনে হয়।


দ্য লাইন

একটা পুরনো গান
যেটা আমার দাদা প্রায়ই গাইতো
তাতে একটা প্রশ্ন ছিলো,
‘নাকি তুমি একটা মাছ হইতে চাও?’
সেই গানটাতেই
সেই একই প্রশ্নটা ছিলো
গাধা আর শূকর নিয়ে
কিন্তু আমার মাথায় যেটা প্রায় সময়ই বাজে
সেটা হলো মাছেরটা
শুধু সেই একটা লাইন।
নাকি তুমি একটা মাছ হইতে চাও?
যেন গানের বাকিটুকু
থাকার কোনো দরকারই ছিলো না।


কুমড়ার প্রতি

আমার ছোট্ট কুমড়াটা,
মাঝেমধ্যে অন্য মেয়ের কথা ভাবতে ভালো লাগে আমার,
কিন্তু সত্যি কথাটা হলো
তুমি যদি কখনো আমাকে ছেড়ে যাও
আমার হৃদপিণ্ডটা আমি টেনে বের করে ফেলবো,
আর কখনো ভেতরে রাখবো না।
তোমার মত আরেকজন আর কোথাও পাবো না।
কী লজ্জার ব্যাপার।


প্রেমের কবিতা

আমাদের বাসায় দেশলাই অনেক।
আমরা সবসময়ই সাথে রাখি।
এখন আমাদের প্রিয় ব্র্যান্ড ওহায়ো ব্লু টিপ,
যদিও আগে আমাদের পছন্দ ছিলো ডায়মন্ড ব্র্যান্ড
সেটা ছিলো ওহায়ো ব্লু টিপ খুঁজে পাওয়ার আগে।
কী চমৎকার মোড়ক এদের, শক্ত
ছোট ছোট বাক্স আর হালকা নীল আর সাদা লেবেল
শব্দগুলো একটা মাইকের আকারে লেখা
যেন চিৎকার করে বলতে চাইছে
“এই যে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দেশলাই,
এর দেড় ইঞ্চি কোমল পাইন ডালের মাথায়
একটা খসখসে গাঢ় বেগুনি টোপর, কি গম্ভীর আর রাগী
আর নাছোড়ভাবে উদ্যত আগুনে ফেটে পড়তে,
জ্বালাতে, হয়তো, তোমার ভালোবাসার মেয়েটার সিগারেট,
প্রথমবার, ঠিক সেবারের মত আর
হয় নি কখনো।
এ সবই দিচ্ছি আমরা আপনাকে।”
সেটাই দিয়েছিলে আমাকে, আমি
হয়ে যাই সিগারেট, আর তুমি ম্যাচ, অথবা আমি
ম্যাচ আর তুমি সিগারেট, বেহেশতের
দিকে ধূমায়িত চুমুতে জ্বলন্ত।


ফ্যান্টাসি ব্লক

আমি চাই একটা সেকশুয়াল ফ্যান্টাসি
জিমের ওই কমবয়সী মেয়েটাকে নিয়ে
ওই যে ওই মেয়েটা, যে
ব্যায়ামের মেশিনে উপর নিচে ঢেউ খেলে ওর
শেষ পিঠের মসৃণ ত্বক মেলে,
যেটা ফুলে ফেঁপে বেরিয়ে আসে নিতম্বের দিকে
ওর চুল টানটান করে পিছনে
এক কচ্ছপের মতো খোঁপায় জড়ানো।
আর একটা মিষ্টি আভা ওর
চোয়াল থেকে একদম কান পর্যন্ত গিয়ে ছড়ায়
যেখানে দোলে দুটো দুল, রূপার, ঝলকানো।
কিন্তু আমি কিছুই ভাবতে পারি না।


কুকুর

টেড আর এডউইনকে ছাড়া
নিউ ইয়র্কের রাস্তাগুলো কেমন ন্যাংটা উজবুকের মতো লাগে
ওদের নিজস্বতা দিয়ে আলোকিত করবার,
ভালোবাসার, এবং মননের,
শব্দটির বেশ বিস্তৃত অর্থে:
নিউ ইয়র্কের রুক্ষ আকর্ষণটা অনেকটুকু হারিয়েছে
আর আমরা যারা আছি তারা পুষিয়ে দিতে পারবো
কিংবা পরবর্তীদের কেউ করবে, তার কোনো উপায় নেই। শুনতে পাই
রাস্তায় ডাকছে একটা কুকুর আর বৃষ্টি পড়ে
ভোর ছটায়, আর এর মধ্যে কোনো উষ্ণতা
বা সুন্দর বা দরকারি কিছু নেই, কেবল
কোনো এক রাস্তার কোথাও কোনো এক কুকুরের ডাক।
ভাল্লাগেনা কুকুরটাকে।


কবিতা

আমি ঘরে বসে
বাইরে বেশ চমৎকার: ঠাণ্ডা
বরফে উষ্ণ রোদ।
বসন্তের প্রথম দিন
অথবা শীতের শেষ।
আমার পা দুটো নামে
সিঁড়ি বেয়ে, তারপর বাইরে
দরজার, আমার উপরের অংশ
এখানে টাইপ করে।


টিক টিক

যখন মানুষ বলে
“সময় চলে যাচ্ছে’’
আমি দেখি একটা অ্যালার্ম ঘড়ি
মাথায় একটা ঘণ্টা
আর হাত আর পা
দরজা দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে
একটা ঘরের, যে ঘরে
সময় থেকে গেছে।
মানবজাতিকে মনে করিয়ে দিচ্ছে
আমরা চলে যাচ্ছি।

আমি এই আইডিয়াটা
ঘরের কোণায় নিয়ে
সন্তর্পণে
নামিয়ে রাখি।
আমি চাই না
ওকে জাগিয়ে দিতে।
এরপর আমি পা টিপে বেরিয়ে যাই।


সস্তার খোঁজ

ধরো, তুমি কোথাও কিছু একটা এতো সস্তায় পায়া গেলা যে,
তুমি কিছুক্ষণ থ খায়া গেলা,
বিশ্বাসই হইতেছে না কেউ এই জিনিস এত সস্তায় দিতে পারে: ঠিক এটাই হয়
যখন তুমি পয়দা হও, আর যতই দিন যায়
দাম বাড়তে থাকে, বাড়তে বাড়তে যতক্ষণ না তোমার জীবনের শেষদিকে
গিয়া সেইটা এত বেশি হয়া যায় যে তুমি চিরদিনের জন্য থ মাইরা পইড়া থাকো।


আরো একটা

ছোটবেলায় শিখছিলা মাত্রা আছে তিনটা
দৈর্ঘ্য, প্রস্থ আর উচ্চতা
জুতার বাক্সের মতন
তারপরে গিয়া জানলা চার নম্বর একটা আছে
সময়
হুমম
তারপর আবার কেউ বলে পাঁচটাও আছে, ছয়টা, সাতটা…

আমি কাজে ক্ষান্ত দিলাম,
বারে গিয়া একটা বিয়ার গিললাম,
গ্লাসের ভিতর তাকাইলাম,
ভাল্লাগলো।



রন প্যাজেট। মার্কিন কবি, গদ্যকার, ফিকশন লেখক। কবি ও শিল্পীদের গোষ্ঠী নিউ ইয়র্ক স্কুল-এর একজন।

পার্থিব মাহমুদ
চট্টগ্রামের পাব্লিক, অর্থনীতির ছাত্র ছিলেন।
চাকরিও একটা করেন, তবে সেটাকে নিজের পরিচয়ের মধ্যে গণ্য করেন না।

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান