চার্লস বুকোওস্কি আর জ্যাক কেরুয়াক সমসাময়িক দুই দাপুটে কবি। যদিও বিট জেনারেশনের কবি হিসাবে কেরুয়াক ‘৫০ এর দশক থেকেই সবার পরিচিত, সেখানে বুকোস্কি তখনও আন্ডারগ্রাউন্ড। দুই জনের ঘাড়েই চাপছিল এন্টি-এস্টাবলিশমেন্টের ভূত, যেইটা তাদের কবিতা থেকেই আন্দাজ করা যায়। বুকোওস্কি ছিল এই লাইনের আরেক কাঠি সরেস লোক, যে হয়ে উঠছিল ‘এন্টি পোয়েট’। ট্র্যাডিশনাল পোয়েট্রিরে কৌতুক করে, প্রাত্যহিক জীবনে মানুষের প্রচলিত মুখের বুলিতেই লেখে গেছেন। কেরুয়াক তার কবিতায় আবার জ্যাজের ইম্প্রোভাইজেশন করছিলেন, জ্যাজ ধারার সঙ্গীতের ফ্যানবয় হিসাবে এমন হওয়াটা অস্বাভাবিক না মোটেও। সেই সাথে ব্যক্তি কেরুয়াকরে জ্যাজ ছাড়াও বুদ্ধ দর্শন, আধ্যাত্মিকতা এমনই বশ করছিল এইসবও তার কবিতার উপকরণ হয়ে উঠছিল। কেরুয়াক সহ তার বিট জেনারেশনের দোস্তদের তেমন পছন্দ করতেন না বুকোওস্কি সাহেব। এদেরকে তার মনে হইত বেশিই রোমান্টিক, ওভারহাইপড। মনে না হওয়ার কারণও নাই আসলে যেখানে বুকোওস্কি নিজে ছিলেন এন্টি রোমান্টিক। কিন্তু কবিতার চিরাচরিত নিয়ম ভাঙার ব্যাপারটায় কেরুয়াকরে বুকোওস্কি ক্রেডিট করতেন। এমন বিপ্রতীপ চিন্তা সত্ত্বেও ক্রিসক্রসটা হয়েছিল ঐ এন্টি-এস্টাবলিশমেন্টের জায়গাতেই। কেউই মনে হবেনা কবিত্ব করতে আসছে, জাস্ট লেখে যাইতেছে সরল ভাবে যা দেখতেছে আর মনে আসতেছে। এই সরল লেখা, প্রাত্যহিক জীবন-বাস্তবতা প্রত্যেকের সামনে যেই আয়নাটা ধরে সেইটা এড়ানোর চেষ্টা বেশ কঠিনই। পাঠকদের কেরুয়াক, বুকোওস্কি কবিদ্বয় একত্রে পড়লে মনে হবে জ্যোতিষের থেকেও তারা মাইন্ডরিড করে ফেলতেছে বেশি। পাঠকের ভিতর থেকে ঘুরে এসে যেন স্রেফ সেইটাই লেখতেছে। এমন আজিব অভিজ্ঞতার সাক্ষী হওয়ার জন্যে প’ড়ে ফালান তাদের কয়েকটা কবিতার অনুবাদ।
চার্লস বুকোওস্কি
দরদি হও
আমাদের সবসময়ই বলা হইসে
অন্যের ভাবনা চিন্তা বুঝার
চেষ্টা করতে
সেইটা যতোই
সেকেলে
বোকা-বোকা
আর বিরক্তিকর হোক।
কাউরে যদি তার
সমস্ত জীবনের ভুলগুলারে
দেখতে বলা হয়
তাদের জিন্দেগি ফুরায় যাবে
উদারতায়,
বিশেষত তারা যদি
বুইড়া হয়।
কিন্তু বয়স তো সেইটাই যেইটা আমাদের
সারাজীবন করা কাজের টোটাল
কেউ বাজেভাবে
বুড়া হয়
কারণ তারা কোনো
দিকনিশানা ছাড়া
জিন্দেগি কাটাইছে,
তারা অনেক কিছু দেইখাও
দেখে নাই।
এইটা তাদের দোষ না?
তাইলে কার দোষ?
আমার?
তাদের ডরের জন্যে
আমার ভাবনা চিন্তারে
তাদের থেকে হাইড
করতে বলা হইত।
বয়স হইয়া যাওয়া তো দোষের না
কিন্তু অনেকগুলা
ইচ্ছাকৃত
নষ্ট কইরা ফেলা
লাইফের মধ্যে
আরেকটা লাইফ হওয়া
শরমের।
আজব চিড়িয়াগুলা
তুমি হয়তো বিশ্বাস করবানা
কিন্তু এমন লোকও আছে
যারা জীবনে
খুবই কম
দুঃখ পায় কিংবা
সংঘাতে জড়ায়।
তারা ভালো পোশাক পরে,
ভালো খায়,
ঘুমায়।
পারিবারিক জীবন নিয়া
তারা খুশি।
তাদের নিজেদের বিষণ্ণতা আছে
কিন্তু তারা সেইটা নিয়া
চিন্তিত না বরং
সবমিলায়ে ভালই আছে।
আর যখন তারা মইরা যায়
সেইটাও খুব স্বাভাবিক ভাবে
সাধারণত ঘুমের মধ্যে মরে।
তুমি হয়তো বিশ্বাস করবানা
কিন্তু এমন মানুষ সত্যিই আছে।
আমি কিন্তু তাদের মতো না।
উহু, আমি মোটেও তাদের
মতো নই,
ইভেন আমি তাদের কারো
মতো হওয়ার
ধারেকাছেও নাই
কিন্তু তারা
সেখানে আছে
আর আমি
এখানে।
শোঁপ্যা বুকোওস্কি
এইটা আমার পিয়ানো।
ফোন বাজে আর লোকেরা জিগায়,
কী করতাছ তুমি? আমাদের সাথে
মদ খাবা?
আমি জাস্ট বলি,
এইটা আমার পিয়ানো।
কী?
পিয়ানো বাজাইতেছি।
ফোন রাইখা দেই।
লোকেদের আমারে দরকার। আমার সঙ্গে
তারা আরাম পায়। তারা কিছুদিন
আমারে না দেখলে ডেস্পারেট হয়া যায়,
অসুস্থ
হয়া পড়ে।
কিন্তু তাদের লগে চললে আমি
অসুস্থ হয়া পড়ি। নিজে না খায়া অন্যরে
গিলানো কঠিন।
আমার পিয়ানো কথা বলে আমার সাথে।
মাঝেমাঝে সেইসব এলোমেলো হয়া যায়
আর তেমন একটা ভালো থাকেনা।
অন্যসময়
আমি শোঁপ্যার মতোই ভালো
বাজাইতে পারি।
মাঝেমাঝে প্রাক্টিসের অভাবে
টিউন ঠিক থাকে না। এইটা নিয়া চিন্তিত
হওয়ার কিছু নাই।
আমি এইখানে বসে কী গুলার উপর
বমি করতে পারি কারণ
বমিটা তো আমারই।
এইসব তিন চারটা লোকের সাথে তাদের
রুমে তাদের পিয়ানো নিয়া
বইসা থাকার চে ভালো।
এইটা আমার পিয়ানো আর
এইটা তাদেরটার থেইকা ভালো।
সেইটা তারা পছন্দ করুক
আর নাই করুক।
শিয়ালগো উদ্দেশ্যে
আমার জন্যে কষ্ট পাওয়ার দরকার নাই।
আমি নিজের লায়েক,
তৃপ্ত একটা লোক।
তাদের জন্যে কষ্ট পাও
যাদের
উসখুস
অভিযোগ
যারা
সর্বদা
সাজাইতে থাকে জীবন
টেবিল চেয়ার সোফার মতন।
ভেলকি মারা দোস্তরা
তাদের
ভাবসাবে
নিত্য
তাদের
ধন্দ
আর যারা তাদের লগে
থাকে কারবারে
তারাও
যাবে জড়ায়ে।
তাদের থেকে হুঁশিয়ার:
আলাপে আলাপে আনে
তারা ‘প্রেম’।
তাদের থেকেও সাবধান
যারা কেবল
মানে
ঈশ্বর
তারা হারায় ফেলসে
নিজেদের
জীবন।
আমার জন্যে কষ্ট পাওয়ার দরকার নাই
এজন্য যে আমি একলা
এমনকি
ভীষণ নিদারুণ কালে
আমার সহচর
কৌতুক।
আমি উল্টা হাঁটা কুকুর
ভাঙা ব্যাঞ্জো
আমি টোলেডো, ওহাইয়ো তে
ঝুলতে থাকা
একটা টেলিফোনের তার
আমি নিজের মতো
আমার রাতের খাবারটা
খাইতেসি
এই আশ্বিন মাসে।
তফাতে রাখো তোমার দরদ।
তারা বলে
সমুদ্র ধরে রাখছিল
যীশুরে:
এট্টুক পার কইরা
আসতে তুমি পারবা
কপাল জোরে।
জ্যাক কেরুয়াক
বাউরি ব্লুজ
মানুষের গপ্প
আমারে অসুস্থ বানায় ফেলে
ভেতরে বা বাইরে,
জানিনা কেনো
সমস্তটা যার দেখনদারি
এমন বহু গল্প মারে
আমারে তা কেবল আঘাত করে।
আমার আঘাত লাগে
ডর করে
আমি বাঁচতে চাই
মরতে চাই
জানিনা
কই যে যাবো
আমি হারায়ে গেলাম
আর বুঝতেও পারতেছিনা
ক্যামনে যে পালাবো
কোনো গির্জা আমারে কয় নাই
কোনো গুরু আমারে ধরে নাই
কেউ উপদেশ দেয় নাই
শুধুই নিউইয়র্কের
পাথর
আর ক্যাফেতে যায়ে
আমরা শুনি
স্যাক্সোফোন
হায়রে মরা রুবি
গুলি খায়ে মরে গেল
বত্রিশে,
পুরান দিনের মতো লাগে শুনতে
তারপর বোমায় ছিন্ন হয়ে
সময় গেলো থেমে।
আর আমি দেখে ফেলি ছায়ারা
নাচতেসে নিয়তির দিকে
ভালোবেসে, জড়ায়ে ধরে আছে
মেয়েদের কোমর
কামাতুর প্রেমে
নিজেদের দেখিতেছে
সাদা অন্তর্বাসে
উঁচা জানলাটায় দাঁড়ায়ে
ভাবতেছি কী যে আছে নসিবে
আমি আর
নিতে পারতেছিনা
আর যদি
নিজেরে সামলাইতে
না পারি
তাহলে বিদায় জানায় দিবো
এই সংসার
আমার জন্যে
এমনিতে
মেয়েরা তো অতোও ভালো না
যতটা তারা দেখতে
আর সমাধি
যে কারো ভাবনার থেকেও বেটার
যখন এইসব চিন্তা শুরু হয় মাথায়
কেমন ঝিমঝিম লাগে
সোনালি ঝলকে দেখি
স্বর্গের ফেরেশতারা বিলাপ করতেছে
বলতেছে
আমরা তোমার জন্যে সকাল থেকে
অপেক্ষা করতেছি, জ্যাক
তুমি এই কালিঝুলি পড়া ঘরে
কী এমন দেখতেছিলা এতক্ষণ
এই দেহাতীত
আলোর দীপ্তিই তো ভালো
(আমি গীত গাই
এই শূন্যতারই)
ঠিকাছে।
বাদ দাও।
পাগল কোথাকার।
থামো।
দোসরা কোরাস মেক্সিকো সিটি ব্লুজ
মাঝপথে থাকা মানুষ উতলা হয়না
মাঝপথে থাকা মানুষ
কিছু নিয়াই চিন্তিত না
সে জানে তার ভাগ্য
এখানেই শেষ না
কিন্তু তার ভাগ্য,
অজানা নিজের কাছে,
সম্ভবত শেষ–
যেইটা নির্বাণ
বর্বর লোক
যারা করে খুন
ভাগ্যে মন্দা তাদের
ভালো লোক
যারা ভালোবাসে
তাদের ভাগ্য ঘুঘু পাখির মতন
দোযখের দুর্ভাগা অধিবাসী সর্পেরা
লুকিয়ে এসেছে
লম্বা ঘাসের মাঝ দিয়ে
ডোবায় ভাসা স্বচ্ছ ব্যাঙের মুখোমুখি হতে
মুসাব্বির আহমেদ হিমেল
◌
ভাদ্র মাসে তাল পাকে শুনে এসে – দুষ্টু পোলাপান যখন পিঠে কিল দিয়ে বলত তাল পাকছে আমরা কিছুটা অবাক হইতাম। তাল গেলটা কই, ওরা কি আমার পিঠ থেকে তাল নিয়ে গেল? বড় হতে হতে আমরা আরও বিশ্বাস করে ফেলি পিঠে তাল পাকে, পিঠ তাল দেয়। তাই আমরা পিঠ বেচে দিই বাজারে। এইটা নতুন কিসুইনা – আমাদের বাপেরা আমাদের বোঝায় তারাও পিঠ বেচে দিয়ে আসছে অফ সিজনে – স্বভাবতই তখন ভাদ্র মাস ছিল না। ভাদ্র মাসে গাছের তাল না খেয়ে পিঠ বেচার মতো বোকা আমরা কেউই না। বস্তুতঃ আমরা কখনো দেখিনি কে আমাদের পিঠ কেনে৷ আলসি মারা শিখে বসন্তকালে আমরা ফুরফুরে হই – আরেকটু বেশি চালাক ভাবি নিজেদের কোকিলের মতো। তখন আমরা নিজেদেরকে উট বলি৷ যেমন উটের পিঠে বহুদিন ধরে জকি ঘুরে আমরা তেমনি একেক সাইজের সিন্দবাদের ভূত পিঠে নিয়া নিই। ভাবি ভূত তো আছে জকিটা কই গেল? সে পিঠ থেকে পড়ে যেতে পারে – তাই আমাদের কত হাহাহিহি; বোকা জকি। তাইলে রেসটা কে জিতল? এই চিন্তা করেই একটা সিজন পার করার পর আমরা তালের চিন্তা করি। গল্পে সরেস কবেকার দরবেশ যেন দেখছে জকিগুলা পিঠে তাল খায়। আমরা খুব চালাক – এখন পিঠে কোনো জকি উঠাইনা। বাপেদেরও পিঠ পচে গেসে; তারা এখনো তাল খাইতে পারেনাই। শেষবার দরবেশ নিজের পিঠ বিক্রির সময় বলসিল আমাদের বাপেরাই নাকি পিঠে জকি হয়ে তাল খাওয়ার পর হারিয়ে যেত।
◌
রাখালের বাঁশির ভেতর র্যাঁবোর কাটা মাথা দেখা আজিব কিছুনা। মুদ্রাদোষে এমন দুই চারটা সিমেট্রিক মাথা আটকায় যাইতেই পারে বাঁশির ভেতর। তবু গরুদের বাঁকা শিংটারে আদর দিতে দিতে ভুলক্রমে যেহেতু রাখাল নিজের ঘাড় বাঁকা করে ফেলসে – তার ভিন্ন দাবিতেও আপত্তি বিশেষ নাই। হ্যামলিনের আমলের বাঁশির পাগলা সুরে যেমন অল্পবয়স্কা বেরোয় গেসিল – রাখাল ঠোঁটে বাঁশি নিলে আমরাও তাই। র্যাঁবো নিজে মাথাটা কেটে এখানে রেখে গেসে – গল্পের গরু নিয়ে আকাশে ঘুরবে বলে। সঙ্গে মাথা রাখলে তার বাতের ব্যথা বাড়ে। কখনো বলে তারা টরিড কাপল – ভুলে র্যাঁবোকে মেরে মাথাটা রেখে দিসে শুধু। অথবা সে ছিল মাতাল জাহাজী। যার নেশারি মাথা জলদস্যু কাটার পর কুড়ায় পাইসে রাখালটা। দীর্ঘ জখমী হাত আমাদের আটকায় ফেলে; এত পিরিত থাকলে সেইটা র্যাঁবোরেও আটকাইতে পারত যদিও। আমরা ঘাই মারি রাখালের গল্পে – আর দেখি, কীভাবে আমাদের মাথাটাও বাঁশির ভিতরে। রাখালের গল্পে ইমানদার হওয়া আমরা কয়জন।



