আগেরবার Renate Lorenz আর Pauline Boudry-কে কান্ডারী করে Queer Art এর না-জানি-কি পার হবার চেষ্টা করা গেছিলো, কিন্তু এবার আসরে নামার আগে দুরুদুরু বক্ষে নানাদেবপূজা করতেই হবে। সৈয়দ মুজতবা আলীর মন্ত্র ধার করা যাক।
“কোন দেবে পূজা করি কোন শীর্নী ধরি?
গণপতি, মৌলা-আলী, ধুর্জটি, শ্রীহরি?
মুশকিল-আসান আর মুর্শীদ মস্তান
কোম্পানি কি মহারানী, ইংরেজ শয়তান?
হিন্দুস্তান, পাকিস্তান, যেবা আছ যথা
ইস্পাহানি, ডালমিঞা, কলির দেবতা।
সবারে স্মরণ করি সিতুমিঞা ভনে
বেদরদ বেধড়ক, ভয় নাহি মনে।।”
Wikipedia-র সংকীর্ণ সংজ্ঞায়নে Queer Art = LGBTQIA+ Art । এ যে আমাদের “কাম কে চিজ নাহি হ্যায়” সে তো গতবারের ঠোঙ্গা হওয়া খবর। কিন্তু শুধু Queer Art -এর সংজ্ঞায়ন, খন্ডন আর উদাহরণীকরণের হরিণ শিকারের জন্য তো এই ধারাবাহিক না। বরং চোরাগোপ্তাভাবে এক ধরণের Queer Aesthetics বা Leo Bersani-র Queer-পূর্ব যুগের লবজে Gay Aesthetics (“Is there a Gay Art?” from Bersani, Leo. Is the rectum a grave? And other essays. University of Chicago Press, 2019) কে গড়েপিটে তোলার প্রচেষ্টাও। Aesthetics বা নন্দনতত্বের শিকার করা মানে আসলেই আর্টের তত্বায়ন করা। আর Art Theory তে আগে আসে Art, Theory তার পিছে পিছে। Theory-r র খুড়োর কল বাগিয়ে জিয়ন্ত-হিলহিলে Art-কে খাঁচায় পোরার বিড়ম্বনা অনেক।
গতবারের চারজন শিল্পীর কেউই নিজের নিজের কাজকে queer art হিসাবে সংজ্ঞায়িত করেন নি। কিন্তু এবারের চারজন চিত্রশিল্পীর চারজনই সুস্পষ্টভাবে তা করেন। কিন্তু সেই চারমজ এক্সিবিশনের ফিতে কাটার আগে আরেকবার, দেব (এবং দেবী) প্রসঙ্গ।
প্রথমেই এক বেয়াদব প্রশ্ন – হিন্দু দেব দেবীদের লিঙ্গ (sex) এবং লিঙ্গরূপ(gender)কি আলাদা? আস্তিকের কাছে এই প্রশ্ন অস্বস্তিকর (মানহানি!), নাস্তিকের কাছে হাস্যকর (পাজামার বুকপকেট!)। দেব-দেবীরা মনুষ্যোত্তর, তাঁদের লিঙ্গ-রুপ-অঙ্গ ইত্যাদি কি মানুষের মাপকাঠিতে বিচার করা চলে? কিন্তু সব হিন্দু দেব-দেবীদের মধ্যে সর্বার্থে সর্বাধিক পুরুষ এবং সর্বার্থে সর্বাধিক নারী – যথাক্রমে শিব ও গৌরী, যাঁরা লিঙ্গম ও গৌরীপট্ট (লিঙ্গম যেই ছিদ্রপরিসরে প্রোথিত) রূপে চিহ্নায়িত, অর্ধনারী হলেও যিনি শিবই থাকেন, লজ্জাগৌরীরূপে যিনি মুণ্ডহীনা পদ্মমুখী উদ্যতযোনি, পুরাণকাহিনীক্রমে তাঁদের লিঙ্গ (sex) এবং লিঙ্গরূপ (gender) মোটেই ম্যাচিং-ম্যাচিং নহে।
তাঁদের সন্তানেরা নালিঙ্গজ, অযোনিসম্ভব। যেমন কুমার শুধু পিতৃরেতঃ-সঞ্জাত, গণপতি মাতৃদেহমল-সম্ভূত। তাঁদের যৌথ parentage শিব ও গৌরীর যে সহবাস দ্বারা সিদ্ধ, তা co-living মাত্র। জগন্মাতা দেবীরা – কালী, শীতলা, লক্ষ্মী – biologically সন্তানহীনা। কালী তো নিজেই লিঙ্গ-স্বরুপা, লিঙ্গরূপী স্বয়ং শিবকে ধরাশায়ী করে তিনি সদা-উত্থিতা। ‘She is herself, first of all, a phallic being, the-mother with-a-penis: she stands triumphantly erect on Shiva’s body, sword raised, fingers pointed, and eyes and tongue protruded.’ (David M Wulff, “Prolegomenon to a Psychology of the Goddess” pp. 283 – 297, in Hawley, John Stratton, and Donna Marie Wulff, eds. The divine consort: Rādhā and the goddesses of India. No. 3. Motilal Banarsidass, 1984.)


পদানত শিবের লিঙ্গের ‘যোনিকরণ’


পুতুল ও ছবি : সৌজন্যে পিনাক বনিক
হিন্দু দেবদেবীরা যে ভীষণভাবে ইয়ে, যাকে বলে gender-fluid (বাংলায় লিঙ্গতরল বললে সেক্সের ইস্কুলে অন্য মুশকিল গড়ায়)- অর্থাৎ তাঁদের দৈবী লিঙ্গোত্তরতাকে মানুষী বিসমলিঙ্গোত্তরতার দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে যে দেখা যেতে পারে আর সেই নিয়ে যে আলোচনা পাড়া যেতে পারে – ভারতের LGBTQ সংস্কৃতি আলোচনার ক্ষেত্রে বা সমসাময়িক queer culture আলোচনার আঙ্গিকে এই ভাবনা কিন্তু একেবারেই নতুন বা নাতিব্যবহৃত নয়। ২০০০ সালের মুক্তার্থনৈতিক ভারতে প্রকাশিত রুথ ভানিতা আর সালিম কিদোয়াঈ এর ঐতিহাসিক বইয়ের প্রথম পরিচ্ছেদের পাতায় পাতায়(Vanita, Ruth, and Saleem Kidwai, eds. Same-sex love in India: A literary history.) দেব দেবীদের লিঙ্গোত্তরপুরাণ। আর তার দু’ দশক পরে নব্যমুক্তার্থনৈতিক ভারতে হিন্দুত্ববাদীদের Indian Queer Community-কে দাবার বোড়ে হিসাবে ব্যবহার করার জন্য থোক থোক স্তোকে দোহাই লাগে দেব-দেবীদের। বিষ্ণুর মোহিনী রূপধারণ, শিব ও অগ্নির রেতঃমিলন, মিত্র ও বরুণ, আরাভান, বহুচরা…. তালিকা খুবই দীর্ঘ।
কিন্তু দেব-মানবের এই gender-fluidity-র সম্ভাব্য তুল্যমূল্য নিয়ে Wendy Doniger এক চমৎকার আলোচনা করেন, যা আমাদের ভাবনার মোড় ঘুরিয়ে দেয় ( পৃষ্ঠা ৩৩০-৩৩১, ‘Bisexuality and Transsexuality among the Hindu Gods’, On Hinduism (New York, 2014 Oxford Academic))। Doniger হিন্দু দেবদেবীদের মধ্যে bisexuality এবং transsexuality-র সংজ্ঞায়ন করার আগে ‘bisexual’ এর সংজ্ঞা নিয়ে কিছু প্রশ্ন তোলেন। কিন্তু আলাদা করে ‘homosexual’ বা ‘transsexual’ এর সংজ্ঞা নিয়ে কিছু প্রশ্ন তোলেন না। তার কারণ নিচের আলোচনা থেকেই পরিষ্কার হবে। সংক্ষেপে আগাম বলতে গেলে – ‘bisexual’ সংজ্ঞায়ন সংক্রান্ত আলোচনায় বাকি দুটি সংজ্ঞাও অন্তর্ভুক্ত। Wendy Doniger-এর প্রশ্ন – এই bisexuality কী ভাবে সংজ্ঞায়িত – ‘হয়ে থাকা’ মানে স্বত্ব সংক্রান্ত নাকি ‘করে ফেলা’ মানে কামিতা সংক্রান্ত? যে দুটি ইংরেজি আভিধানিক সংজ্ঞার সহায়তা নেন Wendy (Britannica Online ও Merriam Webster), তাতে Bisexual-রা দুই লিঙ্গের মানুষের প্রতি আকৃষ্ট বা homosexual এবং heterosexual কামরতই শুধু নন, তাঁরা দুইটি লিঙ্গের যৌনচিহ্ন ও যৌনাঙ্গ একইদেহে ধারণ করেন (hermaphrodite), হাল আমলের সংজ্ঞায়নে ‘bisexual’-এর এই তৃতীয় ব্যাখ্যা জায়েজ না, কিন্তু এই দৈবিক প্রসঙ্গে তা সুপ্রযুক্ত এবং মানুষিক gender identity-র সাথে তার পার্থক্য এখানেই। এই দুটি সংজ্ঞা ও তিনটি লক্ষণ বিধায় দেবতাদের bisexual বলাটা অধিক যুক্তিযুক্ত (এই খোলসাকরণ আমার, লেখিকা তা অকথিত রাখেন )- তাঁদের দ্বিলিঙ্গতা বাস্তবিকই অমানুষিক, কারণ জন্মগতভাবে একই দেহে দুইটি লিঙ্গের যৌনচিহ্ন ও যৌনাঙ্গ ধারণ করেন যে মানুষেরা, তাঁদের সংখ্যা বেশ কম ও তাঁদের intersex বলা হয়। অন্যদিকে হিন্দু দেবতা আর অলৌকিক মানবদের মধ্যে কঠোর-একলিঙ্গী কোটিকে গুটিক। মানুষের মধ্যে intersex দের থেকে বরং সংখ্যায় অনেক বেশি Transgender মানুষেরা যাঁদের যৌনাঙ্গ বিশেষ একটি লিঙ্গের (sex) কিন্তু তাঁদের লিঙ্গরুপ (gender) ভিন্ন। তাঁরা বিপরীত লিঙ্গরুপ (gender) হিসেবে নিজেদের মানেন। নিজেদের জন্মগত লিঙ্গরুপ থেকে সেই লিঙ্গরুপে (gender) পৌঁছানোর জন্য তাঁরা নানা ক্রিয়া ও প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যান – পোশাক, মেকাপ, কণ্ঠ, দেহভঙ্গি পরিবর্তন করেন। এবং তাঁদের মধ্যে কিছু মানুষ নিজেদের লিঙ্গ (sex), শল্যচিকিৎসা করে (sex reassignment surgery)করে বদলে ফেলেন (transsexual)। অতএব এই দৈবী ‘bisexual’ সংজ্ঞায়নের মধ্যে মানুষিক ‘homosexual’ ও ‘transsexual’-ও অন্তর্ভুক্ত। সেই কারণেই এই দৈবী ‘bisexual’-এর বাংলা উভকামী নয়, কারণ উভকামী সংজ্ঞাটি ‘হয়ে থাকা’, মানে স্বত্ব সংক্রান্ত-কে বাদ দিয়ে শুধু ‘করে ফেলা’ মানে কামিতা সংক্রান্ত-কে জারি রাখে। আর এই দৈবী ‘transsexual’ এর বাংলা রুপান্তরকামী না। দেবতারা কামনামাত্রেই রুপান্তরিত হন। তাঁদের কামিতা future tense নহে। বরং তাঁদের কামনা আর ফললাভ (ও রতিলাভ) অপেক্ষা ও বিরতিবিহীন।
দেবতাদের সার্জারি করে Transgender থেকে Transsexual হতে হয় না। এবং তাঁদের অতিমানবিক দেহ একবার নারী বা একবার পুরুষ হয়ে আবার পুরুষ বা আবার নারী বা আবার পুংনারী (hermaphrodite)হয়ে উঠতে পারে, নিদাগ ও অশল্যম্পশ্য হয়ে। কিন্তু মানুষের একবার sex reassignment surgery তে FTM (Female To Male) হয়ে আবার MTF হয়ে নারী লিঙ্গে ফিরে আসা দুষ্কর। এ যাত্রা প্রধানতঃ একমুখ। কিন্তু দেবতারা পারেন, বহুবার পারেন, যতবার চান ততবার পারেন। এই দৈবী non-hetero-sexuality-কে androgyne ( এর বাংলা হতে পারে ‘নার’, যা নর ও নারীর মধ্যবর্তী এক বানোয়াট শব্দ কিংবা সদারুপান্তরময় আলো/আগুনের পুংলিঙ্গ, যা স্ত্রীলিঙ্গে নুর, আরবি থেকে বাংলায় আগত, পুরুষদেবতাদের রুপান্তরক্ষমতার আধিক্যের সাথে মানানসই )বলেন Wendy। কিন্তু প্রশ্ন এই, দৈবী অ্যানাটমিতে ইহা কিরুপে সম্ভবে?

-খ্রিষ্টীয় মতে অ্যাঞ্জেলরা লিঙ্গহীন

– দ্বিলিঙ্গতা যৌনাঙ্গ ছাড়াও চুলের কেয়ারিতে দৃশ্যমান
সংযোজন ও বিভাজন-এর মাধ্যমে – Wendy Doniger-এর পর্যবেক্ষণ মতে। পুরুষদেবতারা খুবই বিভাজনপ্রবণ। একটি দেবদেহ দু’ ভাগ হয়ে এক নারী ও এক পুরুষ সৃষ্টি করে। কখনো তারা একে অপরের দেহ ভোগ করে বা প্রজনন দ্বারা সন্ততি উৎপাদন করে। তারপর এই দুইভাগ পুনরায় যুক্ত হয়ে পুরুষ দেবদেহে ফিরে যায়। এই বিয়োজন (খানিক দেহকোষবিভাজনের মত ব্যাপারস্যাপার) হবার আগের দেহ-কে কি ‘নার’ (androgyne)বললে ভুল হবে? কারণ সেই পুরুষদেহে সুপ্ত আছে এক নারীদেহ (হাফ-লেডিজ?) যা বিভাজনের মাধ্যমে আরেকটি পূর্ণাঙ্গ নারী উৎপাদন করে। কিন্তু হিন্দুমতে পুরুষদেবদেহ থেকে উৎপত্তি আর তাতেই নিষ্পত্তির কারণে এ ‘নার’ অর্ধনারী-অর্ধনর নয়, নর-মাত্র (যেমন অর্ধনারীশ্বর শিবই, গৌরী বা অর্ধনারী নয়)। এবং সেই দুই (অর্ধ)নারী ও (অর্ধ)নরদেহ heterosexual রতিতেই লিপ্ত হয়। তাহ’লে দৈবী bisexual যা একই অঙ্গে bisexual-transsexual-homosexual-hermaphrodite অর্থাৎ এক অনন্য divine androgyne তা শেষমেশ সেই binary নর-নারী cis-het? লেঃ হালুয়া!
আপাতত সেই দেবায়িত হালুয়ার নুর-নার না বেছে, আর তাতে বৈদিক ঘি না ঢেলে এগিয়ে যাওয়া যাক।
Wendy Doniger বিভাজনের আদিমতম উদাহরণ উদ্ধৃত করেন বৃহদারণ্যক উপনিষদ থেকে [1.4.3]: “তাঁর (পুং) আকার ও প্রকৃতি ছিল ঘনআশ্লিষ্ট এক নরনারীযুগলের ন্যায়। তিনি নিজেকে দুই ভাগে বিশ্লিষ্ট করলেন (পত)। উৎপন্ন হলেন পতি ও পত্নী। যাজ্ঞবল্ক্য তাই বলেছেন, “আমরা দ্বিভাজিত খন্ডমাত্র।” খুবই কাব্যিক ভাবে যুক্তিযুক্ত এই বিভাজন কিন্তু বৈবাহিক বিসমকামিতা ছাড়া বাকি সমস্ত সম্ভাবনাকে সযত্নে মুছে দেয়। প্লেটোর সিম্পোসিয়ামে কথিত এরিস্টোফানেসের প্রেমের উৎপত্তি রহস্যও বিভাজনের গল্প। কিন্তু তা নেহাতই মানুষিক। দেবতারা সে গল্পে ভিলেন। আদিমকালে মানুষের চার পা, চার হাত, দুই মাথা, দুটি যৌনাঙ্গ, সব জোড়া জোড়া ছিল। কিছু মানুষ পুরুষ ছিল, দুটি পুরুষের যৌন অঙ্গ সহ; কিছু মানুষ ছিল মহিলা; এবং কিছু ছিল পুংনারী (hermaphrodite), যাদের একটি যৌনাঙ্গ পুরুষের এবং আরেকটি নারীর। আমরা এখনকার দ্বিগুণ মাপের মানুষ ছিলাম, এবং দেবতারা ঈর্ষান্বিত ও ভীত ছিলেন, যে আমরা তাদের উৎখাত করব। জিউস আমাদের ক্ষমতা হ্রাস করার জন্য তাঁর বজ্র দিয়ে আমাদের অর্ধেক কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এবং তখন থেকে আমরা আমাদের অন্য অর্ধেকের সাথে পুনরায় যুক্ত হওয়ার জন্য সারা পৃথিবী খুঁজে বেড়াচ্ছি। খুঁজে পেলে, সর্বশক্তি দিয়ে আমরা সেই অর্ধেকটিকে আঁকড়ে থাকি এবং এর নামই প্রেম। এখানে খোলসা করে বলা না হলেও দুটি ডাবল-হাফ পুং-পুং আর স্ত্রী-স্ত্রীর মধ্যে প্রেমের সম্ভাবনাকেও জারি রেখে দেওয়া হয়েছে। এবং statistically speaking এই আদিম ডাবল-দের মধ্যে hermaphrodite-রা সংখ্যাগরিষ্ঠ না হলে এই যুগে পুং-নারী যুগলের এত বাড়বাড়ন্ত হ’ত না (তাঁদের পুরুষ-হাফ আর নারী-হাফরাই আজকের পুং-নারী যুগল)। অবশ্য বেশীর ভাগ যুগলই (statistically speaking again) প্রেমহীন। অতএব ভুল-ভাল ডাবল-হাফদের মিলন বেশি হয়েছে এটাও বলা যায়। তাই হিন্দু দেবতারা (শিব, বিষ্ণু, ইন্দ্র, অগ্নি) বা হিন্দু দেবী ও দিব্যনারীরা যখন লিঙ্গ একবার পরিবর্তন করেন, বা দু’বার, কিংবা বারোবার – তখন তাকে শুধুমাত্র যুক্তিরহিত, অলৌকিক, সিম্বলিক, Freud-ইক বা Jung-ইক ছাড়া আর কিভাবে দেখতে পারি আমরা?



চিত্র ৪খ – প্লেটোর সিম্পোসিয়ামে কথিত এরিস্টোফানেসের প্রেমের উৎপত্তি রহস্য
চিত্র ৪গ – ইয়িন ইয়াং এর দ্বিত্ব
আমরা যেহেতু Queer Art-এর দৃশ্যরুপ পিপাসু, দেবতাদের লিঙ্গদৃশ্যরুপ (divine dickpic নহে, visual representation of gender) নিয়েই আমাদের আলাপ। সেই রুপ হিন্দু দেবতাদের ছবিতে, মূর্তিতে। সেখানে তাঁরা বায়ুভূত বা মনশ্চক্ষুগোচর নন। তারা সশ্বাস, সরস, সমাংস। শুধু মন্দিরের গর্ভগৃহের প্রতিমাতেই প্রাণপ্রতিষ্ঠা হলেও মন্দিরগাত্রের বাকি সব মূর্তিও প্রাণিত, জীবন্তবৎ। বর্তমান কালের তামিল ‘স্থপতি’ অর্থাৎ ভাস্কররা বলেন যে, প্রাচীন ঐতিহ্যমতে, দেব-দেবীর প্রতিটি শিলামূর্তি হতে হবে যেন জীবন্ত, গা সুপক্ক আমের তেলালো ত্বকের মত, যেন তাকে ছেনে তোলা হয়নি, সে বেড়ে উঠেছে – যেমন বীজ থেকে অঙ্কুর থেকে গাছ থেকে ফল। “The finishing techniques used on the surfaces of contemporary stone sculpture indicate that a fully realized piece should be smooth, tactile, like the skin of a mango. It should look as if it could have grown into its present shape from the inside out. ( Parker, Samuel K. “Unfinished work at Mamallapuram or, what is an Indian art object?.” Artibus Asiae 61, no. 1 (2001): 53-75.)
দেবতারা অমৃতপায়ী, তাই তাঁদের যৌবন শুধু চিরস্থায়ীই নয়, ধ্রুপদী মূর্তিলক্ষ্ণণশাস্ত্রমতে পুরুষদেবতারা সদাই সদ্যবিকচযৌবন, পূর্ণযৌবন বা গতযৌবন নন (যেমন আমাদের আদরের ভুঁড়িয়াল বাঙালি শিবঠাকুর)। ষোড়শ শতকে রচিত সনাতন গোস্বামীর ‘হরিভক্তিবিলাস’ তো দেবমূর্তি গড়ার পাষাণেরও লিঙ্গবিচারপ্রস্তাব করে – পুরুষপাষাণে গড়া হবে দেহ, নারীশিলায় গড়া পাদপীঠ আর নপুংসক পাথরে গড়া পাদপীঠের নিচের অংশ।
মানুষ হোন বা দেবতা, তাঁদের লিঙ্গদৃশ্যরুপ (visual representation of gender) নিয়েই যখন আমাদের আগ্রহ আর তার এতোলবেতোল queering নিয়ে queer art-এর চারমজ exhibition (sexyvision নয়, দুঃখজনকভাবে) এর ফিতে কাটার কুউদ্দেশ্য যখন লেখকের আছে, তখন আমাদেরকে মানুষের প্রাথমিক ও সেকেন্ডারি যৌন চিহ্ন বা বৈশিষ্ট্য নিয়ে কথা তো বলতেই হবে।
উইকি-র বয়ানে – যৌন অঙ্গ বা প্রাথমিক যৌন বৈশিষ্ট্য, যেগুলি নিয়ে একজন ব্যক্তি জন্মগ্রহণ করেন, তা সেকেন্ডারি যৌন বৈশিষ্ট্যের থেকে আলাদা, যা সাধারণত বয়ঃসন্ধির সময় বিকশিত হয় । উভয়ের বিকাশ প্রাথমিক ভ্রূণ পর্যায়ের পরে শরীর দ্বারা উৎপাদিত যৌন হরমোন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় যেখানে Y-ক্রোমোজোম এবং/অথবা SRY জিনের উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি বিকাশ নির্ধারণ করে।
পুরুষের প্রাথমিক যৌন বৈশিষ্ট্য হল লিঙ্গ, অণ্ডকোষ এবং সাবালকত্ব পেলে বীর্যপাতের ক্ষমতা। মহিলাদের প্রাথমিক যৌন বৈশিষ্ট্য হল ভালভা, যোনি, জরায়ু, ফ্যালোপিয়ান টিউব, এবং যুবতী হলে সন্তান জন্মদান এবং মাসিক হওয়ার ক্ষমতা।
অতঃপর এই একপেশে টেবিল। সৌন্দর্যের আদর্শ মানে aesthetic ideals এর মতই এগুলি কিন্তু statistically generalised ideal. যৌবনপ্রাপ্ত যমজ ভাইবোন ধরে ধরে মেলালেও সবক’টির দুই দিকে ঠিক ঠাক টিক পড়বে না।
সেকেন্ডারি যৌন বৈশিষ্ট্য | মহিলা | পুরুষ |
| বড় স্তন , চওড়া পাছা, খাটো উচ্চতা, শরীরের চর্বি বেশী, পেশীর ভর কম , মুখের চুল কম, শরীরের লোম কম, উচ্চ কণ্ঠস্বর ফ্রিকোয়েন্সি, ফুসফুসের ক্ষমতা কম, ছোট হৃৎপিণ্ড | মুখের লোম বেশী, শরীরের লোম বেশী , ছোট স্তন, কণ্ঠস্বরের পিচ ফ্রিকোয়েন্সিতে কম ড্রপ, “ত্রিকোণ” শারীরিক গঠনের বিকাশ, বেশি উচ্চতা, শরীরের চর্বি কম, বেশি পেশী ভর, সরু পাছা, ফুসফুসের ক্ষমতা বেশি, বৃহত্তর হৃৎপিণ্ড | |
| উভয় লিঙ্গ | যৌনাঙ্গের চুল , বগলের চুল | |
ফাঁকতালে দুম করে এই জীববিজ্ঞান ক্লাস নেবার উদ্দেশ্য হ’ল, সেকেন্ডারি যৌন বৈশিষ্ট্যগুলি যে দেবতাদের লিঙ্গরুপ দেখানোর জন্য প্রাথমিক যৌন বৈশিষ্ট্যের চেয়ে অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ সে কথা মনে করিয়ে দেওয়া। কারণ সেগুলি চোখে দেখা যায় ও দেখে পড়া যায়। সেকেন্ডারি যৌন বৈশিষ্ট্য ভিজুয়াল। তাই তা দৃশ্যশিল্পে লিঙ্গদৃশ্যরূপের খাসতালুক। যৌনাঙ্গ-এর মত প্রাথমিক যৌন বৈশিষ্ট্য ঢাকাঢুকি দেওয়া থাকে। শিব ও কালী ছাড়া খুব কম হিন্দু দেব দেবীই নির্বসন। তাও এঁরা দু’জনও অনেক সময়েই কটিতটে ধটিধারী। তাই দেবগণের লিঙ্গদৃশ্যরুপ বিচারে দু ‘নম্বর রাস্তাই ভরসা।
কিছু টুটাফুটা, লেপাপোঁছা দৈবী পাষাণমূর্তির মূর্তিলক্ষণ দেখে তার লিঙ্গদৃশ্যরুপ (visual representation of gender) বিচার মকশো করা যাক। সেকেন্ডারির কান্ডারীর দৌড় কদ্দূর দেখা যাক।

তিনি গজারোহী না -রোহিনী তা শুধু ঠ্যাং-লক্ষণ দেখে বোঝা যাচ্ছে না কিন্তু তাঁর পদতলে কে উপাসনারত আর কে -রতা তা তাঁদের বক্ষদেশ দেখে সংশয়ের অপেক্ষা থাকে না। অনেকের মুখের মোচ, কানের কুন্ডল, কাল মুন্ডন আর হরণ করে নিয়েছে। তাও বুক, মুখের চেয়ে বেশি স্পষ্টবাদী। বুক ছাড়াও লিঙ্গদৃশ্যরুপ নিয়ে বেশি বাঙময় অলঙ্কার আর দেহভঙ্গি । বিশেষ করে ভাঙ্গাঘষা পাথরের মূর্তিতে, যার স্তন টুটে গেছে, রং উঠে গেছে (ভারতের প্রায় সব জায়গার মন্দিরগাত্রের সব মূর্তি রং করা ছিলো, এখনকার তামিল মন্দিরে যেমন থাকে, চটা রং খেয়াল করলে এখনো দেখা যায়) সেখানে এই দু’টিই ভরসা।

এই আপাদমস্তক প্রায় র্যাঁদা-মারা মুর্তিটিকে যদি হাফ-লেডিজ-কিন্তু-ফুল-পুরুষ শিব হিসাবে সনাক্ত করা
হয়ে থাকে তার একমাত্র কৃতিত্ব কোমরের বাঁক বা ভঙ্গ-এর (আর সাথে প্রায় অদৃশ্য একটি স্তন)। সেই ভঙ্গের রকমফের তো আছেই – সমভঙ্গ (অর্থাৎ no ভঙ্গ), আভঙ্গ, ত্রিভঙ্গ, কিংবা অতিভঙ্গ। কিন্তু বাঁক যত কম তত পুরুষ আর বাঁকাউল্লা-বঙ্কিমচন্দ্র হলেই কিম্পুরুষ থুড়ি নারী, হিসেব তত সোজা না। সব দ্যাবা-দেবী সবরকম বাঁক মারেন কিন্তু ত্রিভঙ্গের কপিরাইট শ্যাম-এর। আর অতিভঙ্গ পোজ এতটাই hyper-masculine যে কালী ছাড়া কেউ সেভাবে এটা pull-off করতে পারেন না। এখানে শিব সোজা বলেই তার প্রেক্ষিতে গৌরী বেঁকা, অর্থাৎ নারীতর।

চিত্র ৫ ক এর লিঙ্গদৃশ্যরুপ শুধু ঠ্যাং-লক্ষণ দেখে বোঝা যাচ্ছে না কিন্তু ৫গ এর এই পাদদ্বয় অর্ধনারীশ্বর শিবের তা বোঝা গেলো কেমনে?তাঁদের বাহনের লক্ষণ দেখে। শিবের বলীবর্দ অর্থাৎ ষাঁড় আর গৌরীর সিংহ (এবং হাতের কনকচূড়)। তাহলে, Judith Butler মতে লিঙ্গ (sex) যদি জন্মগত আর লিঙ্গরুপ যদি (gender)সামাজিক-সাংস্কৃতিক ভাবে অর্জিত নির্মাণ হয়, দৈবী লিঙ্গরুপ অর্জন আর নির্মাণের যৌনচিহ্নের মধ্যে কি তাঁদের বাহনরাও অন্তর্ভুক্ত? আর তাঁদের non-penile-vaginal intercourse উদ্ভূত সন্তানেরা? পিতৃরেতঃ-সঞ্জাত কুমার, আর মাতৃদেহমল-সম্ভূত গণপতি-ও কি সেই genderচিহ্নতন্ত্রের অংশ? সেকেন্ডারির উপরের ধাপ টারশিয়ারি যৌন-বৈশিষ্ট্যের অংশ? গণেশের আর কার্তিকের তাহলে তো বোধহয় ঠাঁই বদল হবার কথা ছিল।

অতিরতিময় যক্ষী আর অতিভুঁড়িয়াল যক্ষ থাকা সত্বেও ঠ্যাংসর্বস্ব এই মুর্তিটি অচেনাই থেকে যায়, লিঙ্গদৃশ্য রূপের অভাবে। তাঁর ধটির প্যাঁচ আর পায়ের তোড়া কোন clue দেয় না। কারণ এই পোশাক ও অলংকার কোন লিঙ্গরূপের খাসতালুক না।


এই হাফ-অ্যান্ড-হাফ হেয়ারশৈলী করা (৩ খ ছবির হার্মাফ্রোডাইটির চুলের কেয়ারি আবার দেখুন) অর্ধনারীশ্বর শিবের স্তনাভাবই (এই ম্যাসেক্টমি হয়ত যুগ যুগ ধরে ভক্তদর্শককুল কর্তৃক শ্লীলতাহত হবার কারণে) তাঁর লিঙ্গদৃশ্যরুপকে সূচিত করে।

একদিকে স্মিতহাস্য (শিব) অপরদিকে স্ফুটলাস্য (ভুরু তোলা গৌরী) যেমন লিঙ্গদৃশ্যরূপের আদর্শ (gender ideal), তাঁদের জটামুকুট আর কনকমুকুট যেমন তাঁদের লিঙ্গদৃশ্যরূপের লৌকিক চিহ্ন, দুই ভাগ এক ত্রিনয়নী অলৌকিকতায় মিশে যাওয়া তেমনি অদ্বৈত ঐশ্বরিক আর লিঙ্গরুপাতীত।
হিন্দু দেবতাদের লিঙ্গ আর তার রূপের দ্বিত্ব নিয়ে কাটাছেঁড়া নেহাতই প্রাইডমাসিক ত্যানা প্যাঁচানো যে নয় , তার Exhibit A নিম্নরুপ।

জন মার্শালের মতে সিন্ধুসভ্যতার এই মূর্তি, শিবের এক আদি রুপ – তাঁর অবতার এখানে পশুপতি, তাঁর আসন যোগারুঢ়। কোমরের মাঝে তাঁর উত্থিত লিঙ্গ, থুতনিতে দাড়ি, তিনি ত্রিমুখ (বা তারো বেশি), মাথায় তাঁর শৃঙ্গমুকুট। তিনি যদি শিব হন, তাহলে শিব আর্যদের আসার আগেই ছিলেন। আর্যদের শিবকে ধার করতে হয়নি দ্রাবিড়দের থেকে। এমনকি হয়ত সিন্ধুসভ্যতা এক আর্যসভ্যতাই ছিলো নাকি। শুধু সিলের লিঙ্গদৃশ্যরূপ নিয়েই নানা পাটকেল সাইজ যুক্তিকে জুড়ে জুড়ে ইট আর সেই ইটবাহী কুচকাওয়াজ থেকে এক রাষ্ট্রের উৎপত্তির আদিমান্য যুক্তিইমারত গড়ে তোলা যায়। ইসলামিক পাকিস্তানরাষ্ট্র গঠনের সাথে সাথেই মহেঞ্জোদারোর অবস্থানের কারণে যেমন পাঁচহাজার বছরের মান্য ইতিহাস পায়, ইন্ডিয়া তেমন পেতে চায় বেদ থেকে। আর মার্শাল-কথিত এই তথাকথিত শিবের বুত ও ভূত-এর কারণে পাকিস্তানের বদলে ভারতের ন্যাশনাল মিউজিয়ামের কপালে এই সিলটির সিকে ছেঁড়ে।
আবার ডরিস শ্রীনিবাসন থেকে শুরু করে অনেকেই ঐ সিলের লিঙ্গদৃশ্যরুপ দেখে তাঁকে যূথমাতা বা গণদেবী মনে করেন। সিন্ধু সভ্যতার সিলে আর ভাস্কর্যে পুরুষদেহ সংখ্যালঘু, আবৃত পুরুষদেহ মেলা আরও দুস্তর। তাই নানালঙ্কারভূষণ এই সিল-person তাঁদের মতে পতি বা পিতা নন, মাতা। তাঁর কোমরের মাঝের স্ফীতি কাপড়ের গিঁট, লিঙ্গ নয়। তাঁর দাড়ি দাড়ি নয়, ললায়িত কুন্ডল। তিনি আদি-শিব না হলে অনেক সিদ্ধান্ত , উপপাদ্য বদলে যাবার সুবিধা হয় – সিন্ধু সভ্যতার সাথে বৈদিক সভ্যতার সম্পর্ক, বা দুই সভ্যতার বিপরীতার্থক হওয়ার সহজ বিশ্লেষণ ( মাতৃতান্ত্রিক- পিতৃতান্ত্রিক, নাগরিক-গ্রামীণ, পূর্ব/ উত্তর), তৈরী হ্য় নানা জ্ঞ্রানমূলক, ইতিহাসমূলক অসুবিধা।
জ্ঞানমূলক আর ইতিহাসমূলক অসুবিধার আরেকটি অতিপরিচিত ধরন হ’ল Orientalism। Edward Said-এর কল্যাণে তার সাথে পরিচিত বিজ্ঞজন। পশ্চিমা উপনিবেশপ্রভুরা (যেমন ব্রিটিশ)তাঁদের পূর্বী উপনিবেশের(যেমন ভারত) জল-জমি-জঙ্গল-মানুষ-সংস্কৃতিকে যেভাবে দেখেন, সেই দৃষ্টিভঙ্গি। উপনিবেশকারীদের কাছে উপনিবেশায়িত সবসময়েই কম-পুরুষ। Said “feminine Orient” নিয়ে বলেন যে প্রাচ্যকে পশ্চিমের থেকে বরাবর আলাদা করে দেখা হয়ে এসেছে – তার খ্যাপামো, তার পিছিয়ে থাকা, তার মূক-উদাসভাব, তার রমণীয় ভেদ্যতা (feminine penetrability) আর তার শয়ান নমনীয়তা। পশ্চিমের সব তাত্বিকের, সব পন্ডিতের, সব সাহিত্যিকের এই একই দৃষ্টিভঙ্গি – আরবদেরকে ইউরোপীয়দের দেখভাল করতে হবে, গড়েপিটে নিতে হবে, চাই কি উদ্ধার-ও করতে হতে পারে। (Said, 1978, p. 206). আরও চমৎকারভাবে এই লিঙ্গরাজনীতি বোঝান V. Spike Peterson (2010, p. 17-18); “পুরুষ প্রতীচ্য” আর “নারী প্রাচ্য” ভেদটা ঠিক কী। ‘নারীকরণ অর্থে নির্বীর্যকরণ’ (“feminization as devalorization”) যেই পদ্ধতির মাধ্যমে “প্রাতিষ্ঠানিক উচনীচভেদকে নারীকরণের দ্বারা স্বাভাবিক করে দিয়ে তার রাজনৈতিক সম্ভাবনাকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়”। পুরুষ-নারীর উচনীচ শ্রেনীবিভাগ ঐতিহাসিকভাবে ও সংস্কৃতিগতভাবে সবচেয়ে “স্বাভাবিক” এবং তথাকথিত পুরুষসুলভ ও নারীসুলভ গুণের তুলনামূলক বাজারদরের সর্বসম্মত কায়েমী ব্যবস্থা জারি আছে বহুকাল – যেমন “পুরুষসুলভ” শক্তি, ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণ আর “নারীসুলভ” আবেগ, নিষ্ক্রিয়তা আর সিদ্ধান্তহীনতা। যেমন একজন ব্যক্তিমানুষ যতই নিজেকে পুরুষসুলভ গুণের স্বাভাবিক অধিকারী ভাববে, নারীসুলভ নিম্নতর গুণের থেকে সে যে দূরে ও উর্ধ্বে তা আপনা-আপনিই সাব্যস্ত হবে, তেমনই যে কোন দেশ, শ্রেণী, জাতি বা জনগোষ্ঠীর “নারীকরণের মাধ্যমে নির্বীর্যকরণ” করা হ’লে উপনিবেশকারী আর উপনিবেশিতের মধ্যে ক্ষমতার কাঁটা কার দিকে তা আর খোলসা করে দিতে হয় না পদে পদে। ( Page 21, Orientalism and Its Challenges: Feminist Critiques Of Orientalist Knowledge Production . A PhD Thesis by Sameha Alghamdi, York University Toronto, 2020)। অন্নপূর্ণা গরিমেলার মতে এই নারীকৃত ভারতের সংস্কৃতির মধ্যে হিন্দু ধর্ম আর তার দেবদেবীরা আরও নারীকৃত বা নারীতর। (Garimella, Annapurna. “Engendering Indian Art.” Representing the Body Gender Issues in Indian Art. Ed. Vidya Dehejia. Delhi: Kali for Women (1997): 22-41. ) ভারতের ভারতীয়ত্ব নিহিত যে Indology-কেন্দ্রিক ভারততত্ত্বে – হিন্দু শিল্প বিশেষতঃ হিন্দু দেব-দেবীদের মূর্তি নিয়ে বিশ্লেষণ তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। James Mill ভারত ও হিন্দুধর্মকে সমার্থক করে দেখে হিন্দু দেব-দেবীমূর্তিকে হিন্দুদের অযৌক্তিক, ধর্মভীরু, সমাজচেতনাবিহীন, ইন্দ্রিয়প্রবণ সভ্যতার মানানসই চিহ্ন হিসাবে দেখেন যা দর্শক আর ভক্তদের মানসিক দার্ঢ্য নষ্ট করে তাকে মেয়েলি করে তোলে। Hegel-এর Mill-ভিত্তিক তত্বায়নে ভারতীয় দৃশ্যশিল্প, যার এক বিরাট অংশ হিন্দু দেব-দেবীদের মূর্তি, অন্যান্য ইউরোপীয় দৃশ্যশিল্পের তুলনায় একগুণ বা দুইগুণ না, চার চারগুণ বেশি মেয়েলি, কারণ এক তো তা ভারতের মত কল্পনারাজ্যে তৈরী যে দেশের মানুষ অলস কল্পনাপ্রবণ ( মেয়েদের মত ), পুরুষদের মত দৃঢ়প্রতিজ্ঞ কর্মঠ না। দ্বিতীয় কারণ হিন্দুধর্ম অলৌকিক, যা-ইচ্ছে-তাই, তাতে কোন পুরুষসুলভ জ্ঞান, কাঠামো বা তত্ব নেই। তৃতীয়ত ভাস্কর্য মূলত অলঙ্করণমূলক (তা স্থাপত্যের চেয়ে নিম্নমানের আর বেশি মেয়েলি কলা) আর চার নম্বর হল হিন্দু দৃশ্যকলার অন্তর্নিহিত রস বিস্ময়মূলক, যা নারীসুলভ। ব্রিটিশযুগে ভারতীয় প্রত্নতত্বের আর আর্ট হিষ্ট্রির
জনকপ্রতিম Alexander Cunningham-এর বিশ্লেষণে হিন্দুধর্ম ইসলাম বা বৌদ্ধধর্মের চেয়ে অনেক বেশি মেয়েলি, ইসলাম আর কিছু না হ’লেও একেশ্বরবাদী (হিন্দুধর্মের মত বহুঈশ্বরবাদী বারোভাতারি নয়), বৌদ্ধধর্ম তো গান্ধারে ইউরোপের গ্রীকদের ধর্মের সংস্পর্শে এসে অনেক যুক্তিসিদ্ধ হয়ে উঠেছিলো। অতএব হিন্দুধর্মের দেবদেবীরা যে এলানো-ক্যালানো, ললিত-গলিত হাফ-লেডিজ টাইপ হবেন, তাতে অবাক হবার কি আছে?
নিচের এই তিনটি ছবিই ওরিয়েন্টালিজমের সেই স্বর্ণযুগের। তিনটি ছবিই বিদেশি। প্রথমটির শিল্পী খোদ ব্রিটিশ, দ্বিতীয়টির ফরাসি ও তৃতীয়টির রাশিয়ান। তিনটি ছবিতেই কৃষ্ণের উপস্থিতি। যে ‘অপর’-কে ওরিয়েন্টালিজম নামক জ্ঞানবোধমূলক অসুবিধা নিচুধাপের, মেয়েলি হিসাবে দেখে, শিল্পীর ভাবনায় সেই অপর লিঙ্গদৃশ্যরূপের, এমনকি মেল ন্যুডের দৃশ্যমান পৌরুষের হলফনামা সত্ত্বেও সার্থকভাবে তার queering করে। পৌরুষকল্পনার নতুন দরজা খুলে দেয়। কারণ শিল্পীরা নিজেরা সাহেব হলেও মিলসাহেব, হেগেলসাহেব বা চালাক-শুয়োর-দাপনাসাহেবের (cunning + ham ) মত তাঁরা কল্পনাকে নীচ এক বৃত্তি ভাবেন না। সেটাই কল্পনাই তাঁদের রুটিমাখন। লিঙ্গদৃশ্যরূপে (visual representation of gender) তাই তথাকথিত নারীসুলভ বা পুরুষসুলভ গুণকে কিভাবে প্রদর্শন করা হয় তাও আমরা দেখবো। যেমন লজ্জা যদি শুধুই নারীর ভূষণ হয়ে থাকে, তাহ’লে সলজ্জ পুরুষ আর নির্লজ্জা নারীকে দেখানো লিঙ্গদৃশ্যরূপের একপ্রকার queering। আর নির্লজ্জ পুরুষের দৃশ্যকল্পনাই বা কেমন হবে?

শিল্পীর আঁকা এই ন্যুড সিরিজের আরেকটিতে এই মডেলের হাতে ফেন্সিং-এর তরোয়াল। ‘যুক্তি’ ও ‘কল্পনা’-র প্রতীক হিসাবে যথাক্রমে তরোয়ালধারী পুরুষ ও বংশীধারিনী নারী এই সময়ের বাঙালি ছবিতেও (Bengal School) ঢের আছে। কিন্তু এই বংশীবদনকে যদি আমরা যে-রাঁধে-সে-চুলও-বাঁধে-র পুরুষ সংস্করণ হিসাবে এক কঠোরকোমল যে-ছুরা-মারে-সে-বাঁশিও-বাজাতে পারে বলে ধরে নিই, তবুও আমাদের বাঁকা কালা-র কপিরাইট ত্রিভঙ্গের এক সাদা দেহে প্রতিস্থাপনের নান্দনিক চমক, লিঙ্গরূপের এক অন্য ইঙ্গিত তৈরি করে। আর যারা রাস্তাঘাটে মানুষের ছবি এঁকে বেড়ান তাঁরা জানেন, ভারতের কোণে কোণে বাসস্টপে, রাস্তায় দন্ডায়মান অপেক্ষারত, ঈষৎ-bored পুরুষের দেহে ত্রিভঙ্গ কত সহজ, সুলভ একটি pose। তার সাথে Orientalism, কৃষ্ণভক্তি বা মিলিটারি গোঁফ (ছবির মডেলের মত) বা লিঙ্গদৃশ্যরূপের যোগ তেমন নেই। কিন্তু শিল্পী এই অপরাপর body-swapping দ্বারা একটি অদৃশ্য কৃষ্ণদেহ একটি অতিদৃশ্যমান শ্বেতদেহে প্রতিস্থাপন করে সেই সব সুতোতেই টান মারেন।

একবারে খাস ট্রপিক্সের ঘাসজঙ্গলের এই ছবির ‘স্নেক চার্মার’ নাম তার ভারতীয় অনুপ্রেরণাকে শনাক্ত করলেও এর মূর্তিলক্ষ্মণ কৃষ্ণ-কালী-শিবের জোড়কলম (বাঁশি-গাত্রবর্ণ-সাপ)। ছায়াঘন এই শরীরে শিল্পী নারীশরীরের চিহ্ন আরোপ করেছেন, কিন্তু আমাদের কৃষ্ণ-অভ্যস্ত দেশী চোখ তা যথাসম্ভব অগ্রাহ্য করে। আর একই অঙ্গে ত্রিদেবতার সাথে দ্বিলিঙ্গদৃশ্যরূপের প্রদর্শনী দেখে। কিন্তু বিদেশী চোখ তা দেখে কি?

চিত্র ৭ গ – Léon Bakst , Sketch for the Opera ‘Le Dieu Bleu’ (The Blue God ) (1912-1913)
কৃষ্ণবিষয়ক, রাশিয়ান প্রযোজিত এই ফরাসী অপেরাটি Vaslav Nijinsky-কে লোকপ্রিয়তার দরবারে পেশ করার একটি ব্যর্থ প্রচেষ্টা, এর Liberetto-র সহলেখক ছিলেন Jean Cocteau. এই কাহিনীতে কৃষ্ণ/ the blue god এক প্রেমিকযুগলের মিলন ঘটান নানা দৈবী সংগ্রাম ও চমৎকারসাধনের মাধ্যমে। কিন্তু একই অঙ্গে তাঁর পুরুষসুলভ দানবদলন রুপ ও নারীসুলভ কমনীয় স্নেহ (দুর্গত প্রেমিকযুগলের প্রতি) সাদা দর্শকেরা মেনে নিতে পারেননি। এই ছবির লিঙ্গদৃশ্যরুপেও পেশল আর ললিতের সেই দ্বিলিঙ্গিক সহাবস্থান আছে। যাতে অনেকের মনেই এই নীলদেব এর লিঙ্গরুপ (gender) নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠতে পারে।
হিন্দু দৈবিক gender diversity বল্লেই যে কুমির ছানার মত ‘অর্ধনারীশ্বর’-কে দেখানো হয়, তাকেও প্রশ্ন করেন Wendy Doniger তাঁর উপরোল্লিখিত প্রবন্ধে। শিব ও গৌরী মিলে যে তৃতীয় লিঙ্গ তৈরি হয় না তা তো জানা কথা। কিন্তু তাঁদের মিলনের শাস্ত্রীয় বা পৌরাণিক কারণ কি কি? Doniger -এর মতে তাঁদের মধ্যে দ্বন্দ্ব ও কলহই বেশির ভাগ সময়ে তাঁদের হাফ-এন্ড-হাফ মূর্তি ধরার কারণ, রতি বা মিলনেচ্ছা নয়। এক বিখ্যাত সংস্কৃত কবিতায় শিব তাঁর অর্ধনারীশ্বররূপে সবথেকে বেদনার্ত কারণ এই অবস্থায় তিনি পার্বতীকে দেখতে বা ছুঁতে পারেন না। কিন্তু আধুনিক যুগে অর্ধনারীশ্বর শুধু gender-diversity না, সব রকম ভারতীয় diversity-র ও প্রতীক (চিত্র ৮ গ)।

সমসাময়িক ওড়িশা পটচিত্রে অর্ধনারীশ্বর

চিত্র ৮ খ– লাম্বানি বাঞ্জারাদের সেলাইচিত্রে অর্ধনারীশ্বর
(ফরমায়েসি কাজ ,দক্ষিণচিত্র মিউজিয়াম, চেন্নাই )

বিচিত্রজনকল্যাণ উদ্যোগের লোগোতে অর্ধনারীশ্বর
কিন্তু প্রাচীন ও মধ্যযুগ’ভর সারাভারতজোড়া যে অর্ধনারীশ্বর শিবমূর্তিসকল, তা যদি ভারতের হিন্দু দেব দেবীর লিঙ্গরুপবৈচিত্রের আদিরুপক না হয়, তাতে বিশেষ কোন ক্ষতি আছে কি? তার চেয়ে নিচের চার দৃশ্যশিল্পীর বাছাই করা কাজ দেখলে বুঝবেন লিঙ্গদৃশ্যরূপের বৈচিত্র কত বিচিত্র হতে পারে।
এবং আরেকবার, শেষ বার, হিন্দু দেবতাদের লিঙ্গ আর তার রূপের দ্বিত্ব নিয়ে কাটাছেঁড়া নেহাতই প্রাইডমাসিক ত্যানা প্যাঁচানো যে নয় , তার Exhibit B (তথা Z) নিম্নরুপ চারমজ এক্সিবিশন। যেমন চিত্রসূত্র (পঞ্চম থেকে নবম খ্রী) নামক মূর্তিলক্ষণ শাস্ত্র মূর্তিদেহের রোমকূপ থেকে কোথায় ক’টি রোম বেরোবে সেই নিয়মও বেঁধে দেয় । দেহরোমের মত সূক্ষ্ম সেকেন্ডারি যৌনবৈশিষ্ট্যও যখন দেবদেবীদের লিঙ্গ দৃশ্যরুপপ্রদর্শনের নিয়মাবলীর বাইরে নয়, তখন আধুনিক শিল্পীরা যখন সেই রূপের নিয়মভাঙ্গা queering করেন তখন তাঁরা পদ্মবনে মত্তহস্তীর মত বাঁধ-ভেঙে-দাওx3-দা-আআআআআও mode-এ করেন না বরং মণিকারের মত অলঙ্কার থেকে এক মণি উৎপাটন করে অন্য মণি প্রতিস্থাপিত করার মত বারিকি সূক্ষ্মতায় করেন।

11.7 x 16.7 (inch), Water colour, 2023
সবুজগরলসাগরের গভীরে নিক্ষিপ্ত শাপিত যক্ষই হ’ন বা সবুজ টুনি লাইট জ্বালানো ঘরে দুজন নেহাত মানুষ, এখানে তাঁদের পৌরুষ আর আবেগপ্রবণতার তথাকথিত বিষমানুপাতিক সম্পর্কের queering করে দেহরোমের অনুপাত আর মেহেন্দি ট্যাটু।

11.7 x 16.7 (inch), Water colour, 2023
শুধু পাখির চোখ নামক viable ভবিষ্যতে লক্ষ রাখার মহাপৌরুষেয় বীর্যের যে আদর্শ, তার অন্ধত্ব ও নিষ্ঠুরতাকে queering এর মাধ্যমে উদ্ভাসিত করে এই দুই lovers in denial of their love.

24 x 18 (inch), Water colour, 2023
নানা ঘরোয়া phallic আয়ুধে সজ্জিত এই ধেড়েকেষ্ট অবতারের queerness নিহিত আছে পূর্ণযুবক বাঙালি পুরুষের socially expected বিবাহিত দশার playful বর্জনে।

24 x 18 (inch), Water colour, 2023
রজতকান্ত ও কৃষ্ণকান্তের এই বর্ষামিলনে বৈষ্ণব ও শাক্ত চিত্রলক্ষণ বজায় রেখেই পুরুষপ্রেমের gender role নিয়ে খেলাধুলো করেন শিল্পী।

চিত্র ১১ ক – ‘কালী’, Jyotirmoy Bera, ডিজিটাল ফটোগ্রাফ ,২০২২
গজান্তকমূর্তিতে শিব যখন গজাসুরের ছাড়িয়ে ফেলা চামড়া জড়িয়ে উদ্বাহু হ’ন, তখন গজাসুরের পরাজয় সূচিত হয়। কিন্তু এখানে ছাল ছাড়ানো জ্যান্তকালীর সাথে পুরুষদেহের gender war-এ কি হার-জিত আছে?

ডিজিটাল ফটোগ্রাফ ,২০২৩
মুন্ডমালা গাঁথার গৃহকর্ম কোন gender সুচারুরূপে সম্পন্ন করতে পারেন?

Watercolour, pen and ink over graphite pencil on handmade paper.
20.5 x 28.5 (inches), ২০১৮
এই ছিন্নমস্তা যৌনমিলনরত নরনারীকে পদদলিত করতে চান না, নিজেও মিলিত হতে চান না শিবের সাথে। কিন্তু নিজের দেহতরলের সমবন্টন করেন।

Watercolour, pen and ink over graphite pencil on handmade paper.
20.5 x 28.5 (inches),
২০১৭
এই লজ্জাগৌরী মুন্ডহীনা উত্তানপাদ উদ্যতযোনি নন, সন্তানপ্রসবের পরিচিত ভঙ্গিমায় তিনি যোনি বাগিয়ে বসে নেই। চেতনারূপী চক্ষু বর্তমান তাঁর যোনি এবং পদ্মাকার মুন্ডেও। তাই তিনি যোনিমাত্র নন। শিবের অগ্নিময় তৃতীয় চোখে তিনি সটান চোখ রাখতে পারেন।
চলবে…

সৌরভ রায়। ভিজুয়াল স্টাডিস গবেষক, সম্পাদক এবং ইন্টারনেটভাষা বিউপনিবেশিকরণ কর্মী।
