পুরুষ – গুলজার; (বঙ্গানুবাদ) সাব্বির পারভেজ সোহান

নারী যা-ই করুক না কেন, পুরুষের কাছে জবাবদিহির দায় তার চিরন্তন। কখনো বাবাকে, কখনো স্বামীকে অথবা ছেলেকে। বক্সীর কিন্তু কোনো জবাবদিহির দরকার পড়ে নি যখন সে কান্তার সাথে দেখা করতে শুরু করেছিলো। বরং, রমা যদি তাকে কিছু জিগ্যেসও করেছে, উত্তরে বক্সী বাসনপত্র চুরমার করেছে। কোনো কোনো দিন সেই চুরমার বাসন পেরিয়ে পৌঁছেছে রমার গায়ে। তখন থেকেই রমা আর বক্সীর সংসারে চাপা দ্বন্দ্বের শুরু। যা দিনকে দিন বেড়েছে বৈ কমে নি। দুজনেই তাই কাপ্পুকে নৈনিতালের বোর্ডিং স্কুলে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয় যেন তাদের ভাঙা সংসারের ভাঙা বাসনগুলি কাপ্পুর নজরে না আসে। কান্তার সাথে বক্সীর দেখা হবার পর, রমার প্রতি বক্সীর মনোভাব বদলাতে সময় লাগে নি। রমা বুঝেছিলো, বক্সী আর তার সাথে বেশিদিন থাকবে না, হলোও তাই। হুট করে টেলিফোন আসতো, বেজেই কেটে যেতো। বক্সী তড়িঘড়ি করে কল ঘুরাতো। দিন-রাতের সবথেকে অপ্রত্যাশিত সময়গুলিতেই যেন বক্সীর অফিসের কাজ। সমস্ত লক্ষনই রমা ধরতে পারতো, বুঝতোও সেগুলি…

বক্সী বাড়ি থেকে দূরে থাকা শুরু করলো। অফিসের ট্যুর তো নিতান্ত বাহানা। রমা ঠিকই জানতো বক্সী কোন হোটেলে আছে, কোথায় ও কখন।

এক বছরের মধ্যেই রমা আগে যে ব্যাংকে কাজ করতো সেখানে একটা চাকরী নিলো। কিন্তু, তখনও, জবাবদিহিতার দায়ভার কেবল রমার। নিজের বাবার কাছে। বক্সীর কাছে। উপরন্তু বক্সী নিজেই শ্বশুরকে শান্ত করতে এগিয়ে গেলো। বক্সী জানতো তার নিজের একার রোজগারে দুটো আলাদা সংসার টানা অসম্ভব।

রমাকে তার বাবা একপাশে ডেকে নেয়। প্রশ্ন করে, “তোদের দু’টিতে কী কোনো ঝামেলা হয়েছে রে, মা?”

রমা দৃঢ় উত্তর দেয়, “না, বাবা। ছুটোখাটা ঝামেলা কোন সংসারেই না থাকে… তবে, কাপ্পুর বোর্ডিং স্কুলে যাবার পর থেকেই কেমন যেন দিশেহারা লাগে।”

বাবা আর প্রশ্ন বাড়ায় না। শুধু বলে, “কপিলকে একবার পাঠাস। নানা-নানীকে দেখে যেত।” রমা আর বক্সী একসাথে বলে, “পাঠাবো, অবশ্যই পাঠাবো।”

কানপুর থেকে দু’জনে ফেরত আসে। পরস্পরের কাছ থেকে কোনো প্রশ্ন বা উত্তরের আশা ততদিনে ওরা ছেড়ে দিয়েছে। সত্যিটা যখন চোখের সামনে ধ্রুব বর্তমান, সেখানে ব্যাখ্যার আর প্রয়োজন কোথায়? শান্তিতে আলাদা হয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তকেই তাদের যথার্থ মনে হয়। কিন্তু সমস্যাটা ছিলো কাপ্পু। কাপ্পুকে ওরা কীভাবে বলে, কীভাবে বোঝায় দু’জনার মধ্যে কী ঘটে গিয়েছে? সব কিছুর পরেও, কাপ্পু যে নিতান্ত এক নয় বছরের শিশু।

রমাদের ব্যাংক-ম্যানেজার, রমণ কুমার, সমঝোতা করতে এগিয়ে আসে। দু’জনাকেই বলে যা হয়েছে সব ভুলে যেতে। কিন্তু রমা তো জানে বক্সীর আবেগের তীব্রতা। রমাকেও যে বক্সী একসময় প্রবল-প্রখর ভালোবাসেছিলো।

রমণ এমনকি একদিন রমাকেও এও বলে, “তোমার কান্নার কারণ আমি বুঝি, রমা। কিন্তু আমি অবাক হই বক্সীর চোখে পানি দেখে। আমার সাথে কথায় কিন্তু বক্সী কোনোদিন তোমার বিরুদ্ধে একটি কথাও বলে নি। এমনকি নিজের ভুলও সে স্বীকার করে। হয়তো, মানুষটা বড় বেশিই আবেগপ্রবণ।”

রমা জানতো, বক্সীর মধ্যে হুটহাট ভুল কিছু করে বসার সম্ভাবনা থাকলেও, বক্সীর অশ্রুটুকু ছিলো নিখাদ। বক্সী ভণ্ড ছিলো না।

ডিভোর্স ফাইল করতে করতে আরো একটা বছর চলে যায়।

এর মধ্যে, দু’জন একসাথে অথবা আলাদা আলাদা কাপ্পুকে হোস্টেলে দেখতে গিয়েছে। ছুটিতে মাঝেমধ্যে দিল্লির বাইরে এখানে সেখানে তাকে ঘুরিয়েও এনেছে। অথবা বক্সী যখন অফিসিয়াল ট্যুরে দিল্লির বাইরে গিয়েছে, কাপ্পু রমার সাথে দিল্লিতেই থেকেছে।

কপিল, অবশ্যই, জানতো কিছু একটা সমস্যা আছে। কিন্তু তার সাহসে মাকে সে এটুকুই বলতো, “বাবা হয় আর আগের মত তোমাকে ভালোবাসে না অথবা আমাকে।” “কি বলে রে পাগলটা! অফিসের কাজের ব্যস্ততা আছে না, তাই বাবা অমন।” রমা কাপ্পুর নিষ্পাপ মনে ঝড় তুলতে চাইতো না। “এছাড়া, আমিও তো আবার ব্যাংকের কাজটা শুরু করেছি।”

গুলজার; Source: GettyImages

ডিভোর্সের পরে রমা কাপ্পুর কাস্টোডি দাবি করে। বক্সী রমাকে বাধা দেয় না— হাল ছেড়ে দেয়। বক্সী জানতো কাপ্পুর কাছে কান্তার উপস্থিতি ব্যাখ্যা করার সামর্থ্য তার নেই। আর, কাপ্পুর উপরে সেই ব্যাখ্যার প্রভাবও হতো মারাত্মক। যদিও ডিভোর্সের পরে কাপ্পুকে বক্সী নিয়মিতই হোস্টেলে দেখতে যেতো, রমা কখনোই কাপ্পুকে তাদের ডিভোর্সের কথা বলে নি।

কান্তার সাথের সম্পর্কটাও বেশি দিন টেকে না। কিন্তু ততদিনে না রমা বক্সীকে জীবনে ফেরত পেতে চাইতো, না বক্সীর কোনো ইচ্ছে ছিলো রমার কাছে ফেরত যাওয়ার। সম্পর্কটা ততদিনে ভেঙেই গিয়েছিলো। মেরামতের কোনো রাস্তা অবশিষ্ট ছিলো না। সেই বছরেই ছুটিতে কপিলের বাড়ি আসার সময়ে, দিল্লি থেকে হাজার মাইল দূরের শহর, মাদ্রাজে বক্সীর বদলি হয়ে গেলো। বক্সী হয়তো সব ভুলেই গিয়েছিলো, আর রমার কাছেও আর এই অভিনয় চালিয়ে যাওয়ার শক্তি ছিলো না। কাপ্পুকে সব জানিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় রমা। কাপ্পুরও দুঃখ পাওয়ারই কথা কেননা বাবার সাথে ছেলের যে বড় বন্ধন। কিন্তু, রমা ছেলেকে ধীরে ধীরে প্রস্তুত করবে বলে ভাবে। সারা দিন ধরে সে ছেলের সাথে বাবাকে নিয়ে কথা বলবে এবং অবশেষে রাত্রে তাকে পুরোটা জানাবে। ছেলে কাঁদবে, ছেলেকে সে শান্ত করবে, ঘুম পাড়াতে নিয়ে যাবে।

“মা আছি না, লক্ষ্মী আমার, মা আছি তো…”

বাড়ি ঢুকেই কাপ্পু প্রশ্ন করে, “মা, বাবা কি আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছে? এটা কি সত্যি, মা?”

রমা নিজেকে সামলাতে পারে না। কান্নায় ভেঙে পড়ে। কাপ্পু এগিয়ে এসে তাকে জড়িয়ে ধরে।
“আমি আছি না মা, আমি আছি তো তোমার সাথে, তোমার ছেলে…”

রমা অবাক হয়। বুঝতে না বুঝতেই আমাদের অজান্তে সন্তানেরা কেমন বড় হয়ে যায়!

দুই বছর পরে কাপ্পু সেদিন হোস্টেল থেকে বাড়ি ফিরেছিলো। কাপ্পুর বয়স তখন তেরো।

এর আগের বছরের ছুটিতে কাপ্পু তার স্কুলের ছেলেমেয়েদের সাথে দার্জিলিং যায়। রমা নিজেও তখন রমণের সাথে ক’দিনের জন্য বাইরে গিয়েছিলো। বহু বছর পর রমা ছুটি নিয়েছিলো। শেষবার হোলিতে কাপ্পুর সাথে দেখা করার সময়, রমণের প্রসঙ্গে রমা কাপ্পুকে জানাতেও চায়। কিন্তু রমার ভয় হয়। সে চায় না কাপ্পুর মনে কোনো ভুল ধারণার জন্ম দিতে— যাই হোক না কেন, সবকিছুর পরেও কাপ্পু তো নিতান্ত একটি শিশুই।

এমনকি এইদিনও রমা কয়েকবার করে কাপ্পুকে সব কথা খুলে বলতে মনস্থির করে। কিন্তু, কাপ্পু তো এখনও বুঝদার পুরুষটি নয়। শিশু। যদি কাপ্পু আমার ফুলে ওঠা পেট খেয়ালও করে, সে ভাববে মা’র ওজন বেড়েছে। কীভাবেই বা কাপ্পু আন্দাজ করবে এত কিছু? কিন্তু এইবার, আমি সত্যি সত্যিই কাপ্পুর সাথে রমণের ব্যাপারে কথা বলবো এবং যদি সম্ভব হয় এটাও বুঝিয়ে বলবো যে কোনো হইহাঙ্গাম ছাড়াই আমরা আমাদের বিয়েটা রেজিস্ট্রি করিয়েছি।

কাপ্পু যখন এলো, রমা সমস্ত দিন সমস্ত উপায়ে তার পেট লুকিয়ে রাখলো। ঢিলে কাপড় পড়লো, একবারের জন্যও ওড়নাকে শরীর থেকে সরতে দিলো না, কাপ্পুর জন্য খাওয়াপড়ার বন্দোবস্ত করতে করতে পুরো ব্যাপারটা কাপ্পু যখন রাতে বিছানায় যাবে তখন জানাবে বলে ঠিক করলো।

হঠাৎ, রমা পাশের ঘরে কাঁচ ভাঙার শব্দ শুনতে পায়। দৌড়ে গিয়ে সে দেখে কাপ্পু হাত কেটে ফেলেছে। সারা ঘরে কাঁচের ফুলদানির ভাঙা টুকরো।

“কাপ্পু…?”

কাপ্পুর দিকে এক পা এগোতেই কাপ্পু রমাকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দেয়।

“আমার কাছে আসবে না…”

রমা থেমে যায়। কান্নায় কাপ্পুর কণ্ঠ জড়িয়ে আসে।

“তুমি কি প্রেগন্যান্ট?”

রমার হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে আসে, কপালে ঘাম জমে।

“কার বাচ্চা? রমণ আংকেলের? একটা বাস্টার্ড!”

মূল: Mard by Gulzar
ইংরেজি অনুবাদ: Alok Bhalla
প্রকাশ:
Raavi Paar and Other Stories (1997)



[ গুলজার। কবি, লিরিসিস্ট, স্ক্রিনরাইটার, ফিল্মমেকার, প্রেমিক, পুরুষ। – নয় নাম্বার বাসের হেল্পারগণ ]


[ সাব্বির পারভেজ সোহান – কবি, ফিল্মমেকার। সিলেটের বাসিন্দা। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ছাত্র। ]

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান