তালতলা কলোনির দিকে/প্ল্যানচেটের পর – বিজয় আহমেদ

Jean-Michel Basquiat, Odours of Punt, 1983

মেয়েরা ফিরেছে সূর্য কাঁধে দিগন্তের থেকে আজ

তাদের খোঁপার গান ত্রাতা; চন্দ্র থেকে ঝলসে উঠছে

তাহারা বিপুলা, ব্ল্যাকবেল্টধারী, আক্রমণাত্মক
সারারাত্রি সুরে সুরে জোকস বলবে শুধু;

আহত ষাঁড়ের কথা ভাবো। তার কূঁজ থেকে নেমে আসা সন্ধ্যাগুলোর আড়ালে রাস্তাটা মরে ভূত হয়ে আছে। মোটরসাইকেলটাও কোনো কথাই বলবে না। দূরে হেমন্তের মেয়েরা ভিডিওগেইমস খেলছে। কমিকস পড়ছে। এই জার্নি এন্ডলেস রেখেই হাসতে থাকো…মেট্রোর শপিংমল পুরুষ হয়ে উঠছে। তার গান বিপদজনক। তার হারমোনিয়াম আরও…তুমি বরং আমার সঙ্গে চলো। এই তো রেড, ব্লু…ব্যাংকবুথে প্রেম হয়েও যেতে পারে। তারপরে তুমি দুর্ধর্ষ হয়ে উঠতে পারো।  

***

পৃথিবী কি এখানে এসে, তার ঘোড়াটারে থামায়,
ঘাস খেতে দেয়!
তাঁতঘরে এত হৈ হৈ কেন? ‘এটা কি ২০৬, আগারগাঁও তালতলা’
‘হেই এটা কি তালতলা সরকারী কলোনীর বসন্তদিন?’

পিস্তলের মুখে রা ফুটানোর বিষয়টা ভুলে যাও ভাই, কেননা  
‘এফএম রেডিওর ভাষা তুমি জানো না’
‘হারমোনিয়াম একাই বাজছে জেব্রাক্রসিংয়ে আর ইয়েলো লাইটে শাটার টানতে ভুলে গেছে বোকাচোদা ক্যামরোম্যান’
‘জন্ম-মুহূর্তের গ্যারেজ ভুলে গেছে ছেলেরা’
‘আর সেলাইকলে বার্থডে কেক বানাতে গিয়ে মেয়েরা প্রথম বারের মত জোকস শুনতে পেল জীবনে’

বরং বলি রাত ৮.০০টায় চলো গোল্ডফিশের ঘাড়ে সার্কাসটা চাপিয়ে দিয়ে নাচি।
পরে লং-ট্রেইলারে চেপে মালটাল খাই। টাল হই। দেখি রুবীর ভেসপার পিঠে কী কী হচ্ছে?  

***

‘গমক্ষেতের তাঁবুতে লুকিয়ে, গোপনে, মুখে তুলে দিও স্তন। আসমানের কোন চূড়ায় হেমন্ত বুনে দিচ্ছে হাওয়া ও মেঘ? জেনে রাখো এই মহাপৃথিবীর ঋতু বদলের ঘাসগুলো স্যাটায়ারপ্রবণ খুব; ‘পিঠে নক্ষত্র-খচিত মেয়েদের সঙ্গে জীপসি হোটেলে ঘুরে কী কী অভিজ্ঞতার আপেল পেয়েছ তুমি’ বর্ণনা করতে পারো। না-হয় মেয়রের স্ত্রীর সঙ্গে মৌলভীবাজারের দিনগুলিতে গুম হয়ে যাও। সিএনজি শুধু একটা রাস্তাই চেনে…এই যেমন সেক্স, ড্রাগস, হরতাল, রেডিওজকি..সানগ্লাসে চোখ ঢেকে, মৃত বন্ধুর সঙ্গে ডুয়েলে নেমেছি আজ। আর নেক্সট ভ্যাকেশনের প্রার্থনার গান কেমন হবে ভেবে লিখছি এই সুরম্য গ্রীষ্ম, কচ্ছপ, আট চাকার লরী…

আমি টয়ট্রেনের শেষ বগীটাতে থাকবো
তোমার চুলের বেণী খুলে, সূর্যমুখীদের মত হা হা

হাস্যোজ্জ্বল কচ্ছপগুলোরে ছেড়ে দেব মিরপুরে তখন

পরিচিত কুত্তাগুলো সন্দেহের চোখে তাকাবে খুব জানি
আর ঘেউ ঘেউ করবে

***

তৃণভূমির পর দিগন্তজুড়ে এক রাস্তা। পাশেই রেস্তোরাঁ, খামার, ইতস্তত ঘুরে বেড়ানো গরু, ভেড়া, ভেড়াশাবক, হাওয়াকল, পুলিশফাঁড়ি, রোডস অ্যান্ড হাইওয়ের প্রকৌশলীদের সাইট অফিস, উপজেলা প্রশাসন, শহীদ মিনার, পার্টি অফিস। আর বড় বড় রেইনট্রি, মেহগনি, শিশুর সারি। সূর্য অতিকায় আজ। তাপমাত্রা চড়া। সুবেশী মেয়েরা প্রেমিকের সাথে যাচ্ছে পালিয়ে। তোমার অসুখের নামে গান বাজছে রাস্তার মোড়ে। পিকনিক পার্টি যাচ্ছে ড্রাম বাজিয়ে। সাথে মেয়র। ওষুধের কাছে যাবে তুমি, অথচ তোমার ট্রয়ট্রেন নেই। বিপন্নতার কাছে যাবে তুমি নাকি ভিড়ে যাবে মেষশাবকদের সাথে? ভাবো? মৃত্যু আসে, ওই রাস্তা ধরেই। কিছুটা শীতকালে। কিছুটা সুবেহ সাদিকে। মেয়েরা তোমার জন্য ধাঁধা রচনা করবে জানি। সে ধাঁধা অমর। তুমি নও। তুমি ফেইরীটেলের ময়ূর শুধু। তোমার জন্য অসুখ। আর কিছুটা বিষাদ। রাস্তা তোমার জন্য। তুমি বরং এখানে দু পা শক্ত করে দাঁড়াও। শক্তিশালী হয়ে দাঁড়াও। পাশেই হঠাৎ তুমি একটা ডালিম গাছ দেখে বিস্মিত হয়ে যাবে। গাছে ছড়ানো ফাটা ডালিমের দানা থেকে ঝরতে থাকা রক্ত দেখে তুমি একে অশ্রুকণা বলে ভাববে। ডালিমের রক্ত বলে ভাবতে থাকবে। তার মানে তুমি ডালিম ফল হয়ে জন্মেছিলে। আর তোমার মা আসলে ডালিমগাছ। এক ভোরে তুমি নার্সের পোশাক পরে, কাঁচ-চূর্ণের উপর নাচলে অনেকক্ষণ। তোমার পা থেকে গলগল করে রক্ত ঝরতে লাগল। তারপর সেই রক্তাক্ত পা-সহ তুমি গেলে ডালিম গাছের কাছে। খুব আলতো করে ডাকলে, “মা! মাগো!” অথচ দুটি শব্দ ক্রমে জ্যামিতিক হারে ইকো হতে হতে চরাচরে এমন ভয়ানক ভাবে, বিলাপরূপে ছড়িয়ে পড়ল, মনে হতে থাকল, সারাটা পৃথিবী থরথর কাঁপছে (উফ)!

তারপর সেই অতিসাধারণ ও বিশেষত্বহীন গাছটি মুহূর্তে এক মায়াবিনী মহিলার রূপ পেল। টলমলে চোখ দুইটি খুলে, অবাক দেখল তোমাকে। মানে তার জঠরে পালন করা সন্তানকে। দেখলো, তার সন্তান কাঁদছে হাউমাউ করে। সেই মাতৃরূপও কেঁদে উঠলেন সঙ্গে সঙ্গে। ভেঙেচুড়ে যেতে লাগলেন। সন্তানের রক্তাক্ত পা দেখে মা, নিজের পা-কেও রক্তাক্ত করলেন আর তাঁর চোখ দিয়ে পানি নয় তখন বেরুতে লাগল রক্তের দানা । দানাগুলো জমাট বেঁধে, হীরেখন্ড হতে লাগল। তারপর সেই আকুল ও নরোম মহিলা তোমাকে কাছে টেনে নিলেন। তাঁর মমতাময় শরীরের সাথে মিশে যেতেই আর কোনো ভয় থাকলো না তোমার। বিপন্নতা থাকলো না। গভীর বিশ্বাসী ও শক্তিমান কোনো যোদ্ধার তেজ তুমি পেলে, তুমি পেলে পালের ভিতর খুনসুটিরত দারুণ কোনো মহিষ-শাবকের হাসি। তুমি হয়ে উঠলে রক্তদানা বুকে আঁকড়ে ধরা দারুণ ডালিমফল। অথবা তুমি হয়ে উঠলে তৃণভূমির পর ব্যাপক অহমিকায় জেগে থাকা সর্বদিকপ্লাবী এক দিগন্ত, অসীম যার ডানা, চিরদিন যার বিস্তৃতি।

আমাকেও কিছুটা অট্রহাসি দিও দেবতা ওগো
দূরবীন নামিয়ে রাখো। দূর মানে শুধু নীলাভ পাখি। উপরন্তু বোবা।
(আর নিদারুণ এই গাধার দল মিরপুরে থাকে। ঘুমায়। কোনো এক বসন্তে মরেও যায় আবার)
জল-জঙ্গলের কথা বলো না। মেয়েরা সুইংমেশিন চালাচ্ছে।

এদিকে কোথাও হয়ত ফায়ার সার্ভিস যাচ্ছে, আমার দুঃখী বোনদের গ্রহের দিকে। সেও এক গ্রহ, বেকারীর কারখানার পরেই

শীতনিদ্রার পর মাছ ফিরে ফিরে আসে। আমি শিমুলতুলোর বেলুন বানিয়ে ছুঁড়ে দেই। রাজু ভাই পার্টি অফিসে বসে এই খেলা বুঝে ফেলে। সে তখন ব্যান্ডপার্টি ডাকতে পাঠায় কাউকে। এই নিদারুণ বৃষ্টির দিনে ব্যাঙ-রাজপুত্রের বিয়ে হয়। আমরা সমবেত বোকার দল, হাত মুঠি ধেও ধেও বিয়ে বাড়ি চলি। আর ব্যান্ডপার্টি বাজে। বৃষ্টি হয়। বজ্র-বিদ্যুৎ আমার খাতা জুড়ে বসে থাকে। আনমনে। আর বসন্তের গান শুরু হয় প্ল্যানচেটের পর। আমরা বলি টয়ট্রেন ডাকো! রাজু ভাই তারপর হাসে। অতিকায় অ্যালুমিনিয়ামের ডানার ধার চেয়ে চিঠি লেখা হলে এই নিয়ে অনেক মিস্ট্রি ছড়ায়। পরীর মেয়েটাকে দেখি এই অবসরে কাজীপাড়া পার হয়ে। সবচে’ উঁচু জিপির টাওয়ারের চূড়ায়। আমি তাকে বলি, বিয়ে বাড়ির ধাঁধার উত্তর বলে দিও কানে কানে। হৈ হৈ রৈ রৈ কেউ সাধু রহিম ব্রাদার্স-ও জুটে যায়। বরযাত্রী ওগো কনের হাসি হাসি মুখ দেখো ওই হাওয়ায় উড্ডীন!

ফুয়েল স্টেশনে আমরা তেলের জন্যে ওয়েট করি। দুঃখ হয় আমাদের যন্ত্রগুলো ঢের পুরানো। কমপ্রেসড ন্যাচারাল গ্যাস লাগে না। অথচ গম বুনতে যাবার কথা আজ। মেয়েটার সাথে। আশুলিয়ায় কিংবা ডেমরায়, সূর্যাস্তের আগে আগে। আমার ক্ষুধা আর গান কতটুকু জানে তোমার! তুমি বাজাও মাউথঅর্গান আমার ক্ষুধায়, গমবুনার গানে। তোমার বিয়ে বাড়িকে বলো, আমার ক্ষুধার দিন শেষ হয়ে এলে, ও রাজুভাই, ক্লান্ত এই জুনের বর্ষায় গুটিয়ে রাখবো ব্রোঞ্জের ডানা!

***

অথচ দৃশ্য থেকে যা বুঝতে চাইছো তা দূরবর্তী শস্যের কাছাকাছি থাকে। ঘাঘড়া পরা মেয়েরা আসে, তারা সুশ্রী, সুপেয় পানির জন্যে তারাই প্রার্থনা করে। ভূমি ও শস্যের কথা বলে তারা। দূরে যে হাওয়া মৃতদের নাম লিখে দিয়েছে, নগর থেকে দূরে, নদী-প্রান্তর পেরিয়ে, একটা মৃদু গমক্ষেতের দিকে। স্তন্যদানের চেয়েও পবিত্রতম কোনো ঘটনা এ পৃথিবীতে ঘটে নি আর।  

***

রাস্তায়, জেব্রাক্রসিংয়ে মুখ লুকিয়ে রাখে মাস্তানের দল। এক ভরা সন্ধ্যায় এই নিয়ে গান গাওয়া যেতে পারে

তুমি যে সিদ্ধান্তে আসতে চাইছো – তা করুণ। মৃত ফুল আমরা দীর্ঘদিন দেখেছি ওয়াগনজুড়ে শুয়ে আছে

ওই লাল মোরগ বিধুর – পুরুষালি আমার ক্ষুধার কথা কি পার্টি অফিসে পৌঁছে দেবে?

***

এখানে উত্তর আর দক্ষিণ শুধুমাত্র দিকচিহ্ন বলে কিছু নয়। এরও ভিন্ন ভিন্ন ক্ষমতা কাঠামো, করনির্ধারক, ভাণ্ডাররক্ষক, টিকাদানকারী আর কনজারভেন্সি সুপারভাইজার আছে।  

এর ভিতরে মোরগেরা ডেকে ওঠে এই শহরে। সচকিত ও ভাই কমদামী টিকিটচেকার, রাতে তুমিই যে বেপরোয়া খুনি আমি জানি

বেপরোয়া তরুণী ঐ এসো ঘুঙুর পরা পায়
বেপরোয়া তরুণী ঐ এসো ঘুঙুর জুড়ে শীতকাল
বেপরোয়া তরুণী ঐ এসো ঘুঙুর পড়া পায়
বেপরোয়া তরুণী ঐ এসো কামরাঙাফুল গুঁজে কানে



মেঘের দিনে ময়ূর শুধু
ত্রাণের গানে হেসেই ওঠে
শাটার টেনে লাল গ্যারাজে
আয়ুর ফুল আঁকছ তুমি
পার্টি তোর নাম জানে কি?
ও মেঘ, দূর হাওয়া, নারী?
মেশিন, আজ ঘুমিয়ে থাকো
– রোগ, জীবাণু, আমিষ, স্নেহ
ঘোড়ার দল, হারানো ঘড়ি

আজ উইন্ডস্পিড কত? আর টেম্পারেচার? ঢাকা বাইপাস থেকে যমুনা সেতু তুমি কীভাবে যাবে? তোমার ডানায় ব্যান্ডেজ, রক্তের গান।  

***

যাত্রা শুরুর আগে, তোমার সুইং মেশিন বন্ধ করো। গুগলে জেনে নাও, বৃষ্টির সম্ভাবনা কত? মাঝপথে, ঢাকা থেকে ৮০ কিলোমিটার দূরে হাইওয়ে রেস্তোরা। কে যেন বলল, প্রথমে তোমাকে জানতে হবে যাত্রাপথ; কেননা রাস্তাগুলো মূলত অবসাদের মতন, ওয়ান ওয়ে— কোথাও কোনো এক্সিট পয়েন্ট   নেই। ছিলো না কখনো।    

***

সাঁই সাঁই করে ছুটে যাওয়া হাইওয়ে বাসগুলো বধির। ১২০ কিলো/ঘন্টার কমে এই যানগুলো চলতে জানে না। তাদের নরোম ও এসি নির্ভর প্রাণ। তাদের নিদারুণ ওয়াইফাই আর অতর্কিতে নেমে আসা বৃষ্টি, এই সেপ্টেম্বারে তাদের পথ-সঙ্গী।

এই লাজুক ও উদার সমভূমিতে তোমার শুশ্রুষা আজ মনে পড়ে। ভোরের কুয়াশায় ডুবে গেছে সুফলা শস্যক্ষেত, তার রিহ্যাব, নির্লোম ঊরু, ঊরুর সৌন্দর্য।  

***

রাস্তায় জেলা পুলিশ এবং ফায়ার সার্ভিসের ফোন নাম্বার সহ পথ নির্দেশ আছে। তোমার কাজ এইসব সরকারী নির্দেশাবলী মুখস্থ রাখা। এরপর তুমি অবসাদ থেকে মুক্তি পাবে। কোথাও আসলে পাহাড় তুমি পাবে না। এই রুট সমতল। দূরে রাঢ় বঙ্গ। তারও দূরে, এই দেশের একদম শেষে, পঞ্চগড়ে, ঝিরিঝির কুয়াশায় তুমি হিমালয়ের চূড়ার মাথায় বসে থাকা সূর্য দেখে এসো। এরপর তোমার পরিত্রাণ। আহা, সিরাজগঞ্জ রোডের ডান দিকে মোড় নিয়ে তুমি বগুড়া বাইপাস হয়ে, দূরে কোথাও যাচ্ছো। ধরো যে, ইউএফও’র ডানার দিকে। তার   মানে তুমি রাজশাহী থেকে সরে গেছ। এইভাবে একটা লাজুক গমক্ষেতের কথা তুমি ভাবো। পিঠে প্রগাঢ় কুঁজ, বিদেশের মতন অনাত্মীয়। অপরিচয়ের দ্বিধা বিস্ময়ের মত ঝুলে আছে। তার নীরব পাখা, তোমার ভাষায় কথা বলবে আর কিছু পর। ভাবো পাখপাখালীর   সুদীর্ঘ পা, তোমাকে নিবে কিনা সাথে?

***

পার্টি অফিস থেকে কতটুকু দূরে গেলে তুমি। দূর-নিয়ন্ত্রিত তোমার আত্মা। ১৩০ ইঞ্চির চেয়েও অধিক কোনো স্ক্রীনের সামনে বসে, কেউ একজন ঠিকই খেয়াল করছে সব। সে বোতাম টিপছে আর তোমার বিভিন্ন অ্যাঙ্গেলের ছবি, প্রদর্শিত হচ্ছে। তুমি দূরতর কোনো ম্যাজিকে, রিমোটে নায়ক হয়ে উঠতেছো। তুমি জানো না। আর প্রাজ্ঞ রাজু ভাই তোমার প্রতিটি ভঙ্গির ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ সহ সবাইকে বুঝিয়ে দিচ্ছেন, তুমি এখন কী করতে চাইছো বা আর ১০ কিলো যাবার পর, কোনদিকে মোড় নিবে তোমার অলৌকিক আত্মা। তোমার ডিজেল-জ্বালিত, মহামায়ার সংসার, তোমার ধাতব প্রাণ, আহা    

***

বলো তাইলে কীভাবে ফিরবে মানুষ, তার কৃষিখামার ও হাওয়াকলের দিকে। কীভাবে সে সন্তানের কাছে ধার চাইবে আয়ু। কীভাবে চালকল থেকে ফিরে এসে স্ত্রীর কাছে পুনরায় অনুমতি চাইবে পুরুষ, নতুন ধান বোনার, বলো?  

‘পৃথিবী: চির অবসাদ যন্ত্র
ঘুম: স্বর্গের অচেনা প্যাসেজ
ময়ূর: অদেখা আইন-প্রণেতা আমার
মেশিন: অসুখী ও ক্লীব এক হার্ডরকার…’

এমন চিঠি লিখে, মেয়রের উদ্দেশ্যে, তুমি এই উত্তর/দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের চিড়িয়াখানা থেকে, পার্টি অফিস থেকে, রাজু ভাইয়ের দূরবীনের সীমা হতে, কতটুকু যাবে, বলো? ঘাড়ে এতদিন যে ঘোড়াটাকে পুষেছো, সেও ক্ষেপে উঠছে। সেও রাস্তাকে বিশ্বাস করে না। সেও মহাসড়কে, বিলিয়ন ট্রিলিয়ন কিলোওয়াট খরচ করে, ঘুরাচ্ছে তার প্রপেলার, পিস্টন। যদিও সব শান্ত। নির্জন। মিউট হয়ে আছে। হায়!

আর কত কত মিলিং মেশিন, পেভার, রোড রোলার, এসফাল্ট প্ল্যান্ট আর সারি সারি ডাম্প ট্রাক…তোমার চাকার নীচে জন্ম দিচ্ছে এক সরীসৃপের পিঠ, তার পিছু আরও কত কত মহারহস্যের! সব মিউট, বোবা, উচ্চমর্যাদা সম্পন্ন ধাতব যান।  

Jean-Michel Basquiat, Untitled, 1981

***

মহাপৃথিবীর ঘুম পায়। একটা মৃত ঘোড়ার কাঁধে পা রেখে ঘুমায় বুড়ো যোদ্ধা। তার পাশে রাখা মরচে ধরা রিভলবার, এক পশলা হলুদ রঙ, মায়া-মায়া। ভোরে আযানের শব্দ শোনা যায়। দস্যু জাহাজের চূড়া থেকে একটা ঘড়ি পড়ে যায় সমুদ্রে। নাবিক ভুলে যায় বাড়ি ফেরার পথ। তারপর সে কী কান্না তার। যদিও তারারাজি এই বিপুলা পৃথিবীর কিছু কিছু রহস্যের উত্তর জানে। জানে পাজল শো শেষ হলে, ভাষা খুঁজে পায় পাহাড়-চুড়ো, পা-খোঁড়া ঘোড়া, বৃদ্ধ যোদ্ধা আর দিনফুরিয়ে যাওয়া কোনো র‍্যাম্পমডেল।

কচ্ছপের ডানা আমিষ
যদিও, কই উড়বে এই
দিনে? ফুরায় বসন্তের
মেয়ে, হাওয়াকল জাগছে
নৌযান আসে। চলেও যায়
ঘুরছে তাঁত। নীল শহরে

***

রমণীদের কথা মনে আসে। তারা খোঁপা থেকে ফুল ছুঁড়ে দিচ্ছে। আর প্ল্যানচেটের দুরূহ ভাষায় গভীর কোনো সংকেত লিখে রাখছে। যেমন ভোরের তারকারাজি, অবিরাম বিশ্বাসঘাতকতা করে যাত্রীদের সঙ্গে।  


***

নীল প্ল্যানচেট করি, এসো, দূর কোনো আত্মার সাথে, ডালিম ফলের সাথে। এ যোগাযোগ তারবিহীন। একটা প্রেরক ও গ্রাহক যন্ত্র শুধু ধাঁধার মতন জেগে থাকবে। ‘অবসাদ হলো তোমার পিতার নাম’ এই বলে হাঁক ছাড়বে কেউ। তুমি অবাক হয়ে ভাববে, এই বুঝি হলো সংযোগ স্থাপন—কোনো দূরতমের সাথে।  

***

তারপর ঘাগড়া সুন্দরীকে ডাকো। সে নাচুক। বসন্ত ডেকে আনুক। তার কাঁধের ওপার থেকে জেগে উঠুক পবিত্র সব সূর্যাস্ত। বিপর্যস্ত জাহাজ যমুনা নদীতে (টাঙ্গাইলে), এসে পেয়ে যাক তার শিশুতোষ রুক্ষ্ম সব ঋতু। পৃথিবীতে এমন হয়। এই মহামায়ার সার্কাসে। হঠাৎ খরগোশগুলো একটা লালতুলোর বল পেয়ে বিহবল হয়ে যায়।  

***

অনেকটা যেমন হয়, সেমি আর্বান রুপগঞ্জের কোনো কারখানার সামনে ৫/৬টা মোরগ গলা উঁচিয়ে অজানা কাউকে খেয়াল করে। মাথার উপর তাদের ঝুলে থাকে নিঃসঙ্গ সাদা-নীল মেঘ, চিমনীর ধোঁয়া। একটা আচমকা ও অনাকাঙ্ক্ষিত বিকেল। শ্রমিকের দল। তাদের পাশ কাটিয়ে যাওয়া মালিকের গম্ভীর পাজেরো। মালবাহী ১০ (দশ) এক্সেলের যান। ‌এইসব ধাতব উট, স্বর্গ থেকে ছুঁড়ে দিয়েছে আল্লাহ্। এদের অতিকায় শরীর, লম্বা গলা, গলার নীচে পানি সঞ্চয়ের থলে। তারপর সন্ধ্যাগুলো খুব নরম কমলালেবু যেন। আসে, ধীর পায়ে। যেনবা রমণীর কাছে যাচ্ছে কোনো সুদর্শন ও বুদ্ধিদীপ্ত তরুণ।  

***

দূরে ধুলো ওড়ে, বিষণ্ণ ধুলো। ক্লান্ত হাটুরে, জিলাপীওয়ালা, সেলুনের কর্মচারী ওই সূর্যাস্তের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকে। আর সূর্যটাও যেন তার সুরেলা ও তীব্র সোনালি আলোর আভায় গিলে নিতে থাকে এই শহরতলী, পানদোকান, ব্রিজ, ভাগাড়ের দিকে উড়ে যেতে থাকা কাক, ছ’তলার ছাদে বাসা বাঁধা তরুণজুটির অন্তর্বাসের রঙ।  

***

কিছু কিছু সন্ধ্যায় লাল উলের বল বানাতে থাকা মেয়েরা ভাগ্য গণনা করে। তাদের আছে কথাবলিয়ে কিছু টিয়া। তারা ডিশএন্টেনার মত সংকেত-নির্ভর। প্রতিদিন কিছু কিছু পুরুষ পার্টি অফিস থেকে পালিয়ে আসেন এখানে। সাথে থাকে এক প্রকার শীতল হাওয়া। লাল উলের বলগুলো নাচে আর ভাগ্য পরিবর্তন হতে থাকে অনেকের। আর যারা নিয়তিতাড়িত কুকুরটাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে রাস্তায়, তারা আসলে বাড়ি ফেরার কথা ভুলে গেছে। মেয়েদের জরিকাটা আসমানের অপেক্ষায় আছে। শস্যক্ষেত্রে নতুন ফলনের দিন এলো বলে। নোংরা কয়েকটা ভেড়া ফুটপাথে বসে জাবর কাটছে অনবরত। সৌরশক্তি থেকে গলে গলে পড়ছে সুফলা রমণীদের শক্তি ও অহংকার।  

***

ভোরের কুয়াশা-ক্ষীরের মতো চতুর্পাশ থেকে ভেসে আসছে হিন্দি গান। থোকাথোকা আলো ফলের মত ঝুলে আছে গলি উপগলির ভিতরে। ‘গ্যারেজে টানছো কেন সন্ধ্যায়, আনোয়ার’ এই বলে রহস্য ঘন করে দেয় রমণীরা। পার্টি অফিসে প্রথম প্রেমই এসেছিলো, মনে পড়ে— বিশ্বাসঘাতকতা নয়।  

***

অলস এক ঘড়ি নির্মাতা বুড়ো স্ট্রিট লাইটের নীচে, ঘড়ি সারাই করছে, আগারগাঁও তালতলায়। তার চশমার উপরে মোটরবাইকের আলো এসে আছড়ে পড়ে। মনে হয়, আলো কুসুমের মতন। সাবানের মসৃন বুদ্বুদ বলেও ভ্রম হতে পারে। (একটা টয়ট্রেন, বাচ্চা ছেলের হাত থেকে পড়ে যাচ্ছে। ছয়তলা থেকে।) কয়েকটা আপেল পড়ে আছে প্লেটে। নার্সের নির্লোম পায়ের উপর দিয়ে পালাচ্ছে একটা ইঁদুর। (যাও বাউন্টি কিলার যাও, পালাও, যাও হে পুলিশ দ্রুত।)

***

আজ ২৪ অক্টোবর রোজ সোমবার। উত্তুরে হাওয়া বইছে। খানিকটা শীতল হারমোনিয়ামের দিন।  

তুমি বললে, ‘হেমন্ত চলছে। খোলো রান্নাঘর। হারিয়ে যেতে চাই’
– ‘কোথায় সে অফুরান ডানা, সৌরশক্তি! বলো?’
– ওই নীল গ্রহ, ওই অসীম স্পেসে বৃষ্টি দেখে দেখে তুমি মরে যেও
– মাঝপথে একটু থেমে নিলে ভাল। ব্যাকপ্যাকে সেভেনআপ, চিপস, ছুরি, নেইলকাটার ইত্যাদি আছে কিনা দেখে নেয়া যায়।

***

হাওয়াকল শরীরের বাইরে থাকে। (দুই পাশে পাহাড়। সারিসারি উঁচু উঁচু পাহাড়। তার মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে রাস্তা। নাক উঁচু করে। কখনো-বা হুট করে নীচে নেমে গিয়ে। আর উত্তুরে হাওয়া বয়ে যাচ্ছে সাঁই সাঁই করে। এইখানে তোমার হাওয়াকল, চলছে।) রাস্তা থেকে দেখা যায়। ভিতরে উৎপাদিত বিদ্যুৎ প্রয়োজনের অধিক জমা হলে, একটা সময়ে বিস্ফোরণ ঘটবে মনে রেখো!

আনমনে এই ধাতব চাকা ঘোরে। কার কথা মনে করে! রিবন হারিয়েছে যে মেয়ে, বেড়াতে এসে, তাকে?

***

আর শ্যামা মেয়েরা, পিঠ থেকে সুইংমেশিন নামিয়ে জিরোতে বসে। মাথার উপর রেইনট্রি। এই হেমন্তে ধু-ধু ধানক্ষেত চারপাশে। তারা বসে আনমনে গান গায়। গানের উপর একটা ঘাসফড়িং নাচে। তাদের বেণীতে গুঁজে কে দিয়েছে লালজবা? তারা পানের পিক ফেলে আর হেসে হেসে ঢলে পড়ে বান্ধবীর উপর। হাওয়া এসে লালজবার পাপড়িগুলো নাড়ায়। তাদের প্রাণও নড়ে, সেই সাথে! (নতজানু হও প্রার্থনায়। ফিরে এসো মাগরেবের আযানের আগেই।)

(জনপদ ফুঁড়ে উঠে আসতে থাকে এক প্রাচীন জাহাজ, এই অবসরে। জাহাজভর্তি হিরা-জহরত মণিমাণিক্য কবুতরের হীরের ডানা ও নানান রঙের ময়ূরের পুচ্ছ)

***

অগ্রহায়ণ

কৃষি বিপ্লবের দিন চলে গেল। শোনা
হলো না তোমার হারমোনিয়াম। এই
এক গাঢ় বেদনা ট্যাক্সি ক্যাব থেকে
গড়িয়ে পড়ে, সন্ধ্যায়। তখনো সূর্য
ডোবেনি। জেলা শহর ছেড়ে আসা ক্লান্ত
বিলাসবহুল বাসগুলো, গোঙাতে
গোঙাতে ফিরছে। তুমি চেম্বার করে
ফিরছো, দূর চট্টগ্রামের কোনো প্যাঁচা
মিয়ার গলিতে। ডালিমের বাগান
বুনেছো, জানি। লাল লাল সব শস্য,
বুনে যাও। এই মনে পড়ে। আর কিছু
নয়। পার্টি অফিস বলতে কিছু নেই।
শুধু গ্যারেজ আছে, প্রণয়ের।

শীতকাল

উটপাখি, তোর পা দেখি দূরবীনে;  
পা, তোর ডানা গজাচ্ছে আজ!  
আমি কাঁধ পেতে দেই, তোর পা আর তার ডানা–  
উড়ে যাক, দূর কোনো বিদেশী সূর্যাস্তের ভিতর
শুধু সকাতর ঐ তিল, তরুণীর ডান গালে, উন্মুখ বেঁচে
থাকুক, আরো কিছু কচ্ছপের সাথে, করুণ কোনো ডালিম বাগানে
পা, তোর ডানা গজাচ্ছে আজ!

***

উত্তুরে হাওয়া বইছে। সুদর্শনাদের চুল উড়ে আসে।
কয়েকটা পোষা কচ্ছপ শীতঘুম কাটিয়ে, ঘুরতে
বেরিয়েছে। মনে পড়ে আমার ব্যক্তিগত
গোয়েন্দাদল চট্রগ্রামে গেল। আজ, সকাতর ওষুধের
দিনে তোমাকে মনে পড়ে অথবা পড়ে না। উৎসবের দিনে
ব্যান্ডবাদকের দল তাদের ড্রাম, হুইসেল,
হর্ষধ্বনি আরো কিছু বিপন্নতাকে গাঢ় করে তোলে।

***

২৮ জানুয়ারী, ২০১৭। তুমি ডালিম বাগানে হাঁটু
গেড়ে বসে থাকো। এই শাস্তি তোমার। শীত
অনেকটা কমে এলো। উইন্ডস্পিড প্রতি ঘন্টায় ৪.৩
মাইল। আর্দ্রতা ৬২ শতাংশ। ভিজিবিলিটিও মন্দ
নয়, প্রতি ঘন্টায় ১০ মাইল। লংড্রাইভের জন্য
ভালো! তোমার ব্যক্তিগত খামারে আজ দুপুরভর
রেডিও বেজেছে। অন্ধ মেয়েটিকে বাবা চিনিয়েছে
রং। রঙের এক প্রকার নিজস্ব শব্দ থাকে। কান
পাতলেই কেবল এটা আবিষ্কার হয়। কিংবা ধরো
লাল বললেই যে অনুভূতি ছড়ায়, সেই অনুভূতিই
এই মহাপৃথিবীর সবচে রহস্যময় ও মৌলিক বিষয়।

***
তারপর কান্নার ভঙ্গি…

তোমার কান্নার ভঙ্গি আমার চেনা। কোমল
কামরাঙার মতন। ভাষা ফুরোবার পর, মানুষের
আসলে আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। (শুধু
মাঝরাত্রিতে, হাইওয়ের পাশে, (মির্জাপুরে), বোবা
স্টেশনারী দোকানের মত এই বেঁচে থাকা)। আসলে
মাছ আর মানুষ যমজ মূলত, একই শয়নপ্রতিভায়
তারা শীতকালগুলো কাটিয়ে দেয়; তারপর সঙ্গী
বদল করে, যেমন বিবিধ উদযাপনের দিনে রঙ
বদলে যায়।

***

পার্টি অফিসে প্রেম করেছিলাম আমরা।
বলেছিলাম, আমার কাঁধে বেঁচে থাকো ট্যাটুর
মতন। তখনি বৃষ্টি এলো। টানা তিনদিন। তুমি
নোট টুকে রাখলে, অদ্য ১৯ অক্টোবর, ২০১৭;
বাদলদিন শুরু হলো (কৌতুক)

***

কাঁধ নিদারুণ এক মরুর জাহাজ। নীল মরুভূমির
মধ্যে যেন টেনে চলছে পুরোটা শরীর, নানাবিধ
তাঁবু, ভূত, ওষুধ আর পানির পেয়ালা। আমরা
কেউই পাইনি কারো ডানার ভার। শুধু দীর্ঘশ্বাসের
মাছের এন্টেনায় বুনে রাখা কিছু ডালিমের বেদনা
এঁকেছি।  

Jean-Michel Basquiat, Glenn, 1984

সাধারণত বেঁচে থাকার বিষয়গুলো নির্মম হেয়ালিপূর্ণ হয়। রিহ্যাবের মতন ড্রাগস, ডাক্তার, ছুরি আর দুঃস্বপ্নের সন্ত্রাসের গলি। বসন্তের মৃদু বাতাস আসে এর মধ্যে। জানালা গলে। রাত্রে ওঠে চাঁদ আর ক্ষীরের মতো সঘন জোছনা। কেউ কাউকে না-জানার দিনগুলো সবচে’ রোমাঞ্চকর। অচেনা শরীরের সুবাস সে কী তীব্র, জেনেছি ১২ মার্চে। হাওয়া বইছিলো দক্ষিণের দিকে। থক থক গরম হাওয়ার শাসনে যখন বিপর্যস্ত সবকিছু, উত্থানের শুরু তারপর থেকে। ওই মুহূর্তে পার্টি অফিসের কোনো নাম থাকে না। যা থাকে বায়বীয় কূটালাপ। আর এক শাস্তির মত উত্থান। যখন দুই কাঁধে ডানা জুড়ে আমি এক আসমান থেকে অন্য আসমানে, এভাবে ১ম থেকে ২য় আসমান, ২য় আসমানের পদ্ম চুরি করে, ক্রমে ৭ম আসমানের দিকে ধাবিত..

***

দৃ্শ্য দেখছিলাম, মা তিব্বত পমেড মাখছেন। তার এলোচুল। তার সম্মুখে অনড় এক আয়না। যার হাসি থেকে ঠিক ১২ ডিগ্রি কোণে ঘুরে গেলে ২০ বিঘার ধানি জমি। সেখানে নদীর মতো বাতাসের ঢেউ। কেউ কেউ বলে, বাতাসের মিম্বর বাতাসের পাতাল। সে-মুহূর্তে যদি আয়নাকে জিজ্ঞেস করো, ‘কী তাহার নাম?’

সে উত্তর করে, ‘ইহার নাম মাতা। চিরকালীন এক সত্ত্বা। খোদার পবিত্রতম আত্মা নিয়ে জন্ম নেওয়া এক পাপী।’

***

আনোয়ারকে তখন বারবার বলা হচ্ছে, ঠিক দুপুর ৩.২১ মিনিটে পূর্ব থেকে তেরচা করে বেঁকে যাওয়া বাতাস লাগায় তার মুখ বেঁকে গেছে। কথাগুলো যখন বলছে পাড়ার ডাক্তার তখনো আনোয়ারের স্ত্রী ব্রা পড়েনি গায়ে এতই আলসেপনায় মুখর সে দুপুর।  

আনোয়ার ভাবছিল, কেন যে সে সঙ্গম শেষে পাক (পবিত্র) না হয়েই বিড়ি ধরাতে গেল পাড়ার দোকানে। তখন কানকাটা মিলনের দোকানে অবিকল আনোয়ারের স্বরে কম্পিউটার বেজে ওঠে মিউজিক। আর সে কী বিস্ময় হিন্দী গানের বদলে আনোয়ার বলতে থাকে:

আমার অসুখ নেই কোনো আর জান
ভ্রমণের গন্ধ নেই মৃতদেহে। শুধু

বৃষ্টি শেষে হাওয়া আর রেডিওতে শুনেছি
যুবতীদের হাসি ধাক্কা খেয়ে মরে যাচ্ছে;

***

এইসব শব্দ যেখানে ১০-তলা বিল্ডিং আর ৩৮- সাইজের স্তনের খাঁদে আছড়ে পড়ে, তখন মহাশিঙ্গা বাজে। অবিরাম ভু-উউউউ…ডাকে। আমি আনোয়ারের কাঁধে চড়ে বাড়ি ফিরতে ভুলে যাই। তালতলা কলোনি থেকে মাত্র ৮৫০ মিটার দূরত্বের হাসান ফিলিং-স্টেশনের পাশ থেকে। পাশেই, ৫টা তিল ফুটে আছে যেন আধো আধো নীল নক্ষত্র থেকে মৃদু কিন্তু সুতীক্ষ্ণ হাসি ছলকে আসে।


***

যদিও হাসির কোনো মানে নেই । তবু আমি জানি অলক্ষ্যে কেউ, তাক করছো জার্মান .৫ বোরের পিস্তল। বলছো, ২৫ জানুয়ারির পর থেকে ক্ষমা বলতে কোনো শব্দই ছিলো না পৃথিবীতে ১২ দিনের জন্যে। তখন পৃথিবী তিব্বত পমেডের আঠালো তরলের ম্যাজিকে মজে ছিলো। তার পাশেই ছিলো মিউট পাওয়ারপ্ল্যান্ট। কোনো সেনাদল নয়। শুশ্রূষা নয়। সঙ্গম নয়। দুগ্ধদানের মত পবিত্র কোনো ঘটনাও ঘটেনি সেইসব মহাপাপের দিনে। শুধু ট্যাটুর পিস্তলগুলো জেগে উঠেছিলো। তামাটে ও বাদামী কোটিপতি নারীদের নিতম্বের ত্বকের নিচে লুকানো চিপসের গোপন কোডগুলো অর্থময় হয়ে উঠছিল। সবকিছু ছিল পাপের কিন্তু সরস, প্রাঞ্জল। হাওয়াকলে উৎপন্ন বিদ্যুৎ সেসব দিনে ছিল শান্ত, খুব নির্জন। যেনবা বসন্তদিন শেষে, মেয়েদের এলোচুল, চুপচাপ ভাষাহীন পড়ে আছে, পরিহাসপ্রবণ দুটি ডিম্পলের কাছে পুরুষবিহীন…

***

থ্রিডি গ্লাস চোখে দিয়ে, রমণীদের খোঁপায় দুয়েকটা গোল্ডফিশ ছেঁড়ে দিয়ে এর মধ্যেই বসে আছে এক খুনী।
আর ছক কাটছে পরিবর্তী নিশানার। টার্গেটের। হত্যার।

অথচ শহরে একটাও এফএম রেডিও ব্যবসা-সফল হলো না। কেন যে হলো না আনোয়ার— জানো?

***

ঘনায়মান সন্ধ্যা পাকিতেছে বলে আসমান অধিকতর মেরুনরঙা তথাপি মন্থর গতিতে নর্থিং-ইস্টিং সই করে আনোয়ারকে কে বা কাহারা যেন নজর করিতেছে যদিও ঘটমান চাঞ্চল্যকর ঘটনা তাহার নিকট অদ্যাবধি অজানা। বছর পাঁচেক পূর্বে তাহার অজ্ঞাতে বাম কাঁধের নিচে স্থাপিত চিপস ক্রমাগত বিভিন্ন সাইন, সিগন্যাল ও ডেটা প্রেরণের মাধ্যমে স্বীয় কার্যক্ষমতার স্বাক্ষী-সাবুদ প্রদান করিতেছে বলিয়া আমরা জ্ঞাত হইলেও আনোয়ারের মতন কোনো ক্ষুদ্রপ্রাণ এই মহাপৃথিবীর কোন জ্ঞান অন্বেষনের কাজ লাগিতেছে তাহা অনির্ণেয়। ইহা এক প্রকার স্যাটায়ার বলিয়া ভ্রম হইলেও মূলত ট্র্যাজিডি। কেননা এই শতাব্দীতে মানুষ যে তাহার নিজের সম্মতিতেই পরীক্ষা-নিরীক্ষার একপ্রকার প্রাণীবিশেষ মাত্র, তাহা আমরা জানিয়াও এর বাহিরে অবস্থান করা সম্ভব হইতেছে না। শয়নকক্ষে স্থাপিত ডোমক্যামেরায় ধরা পড়িতেছে ঊরুসন্ধির ঘা, সঙ্গমের উত্তেজনা আর যাপিত জীবনের ক্রুর ও মায়াবী অনুষঙ্গ। বিশেষত বুঝিয়াছি হাওয়া বলিতে যা বুঝি তা মূলত বিবিধ ডেটার আধার; মেঘ বলিতে যাহা বুঝিয়াছি, তাহা অত্যাধুনিক সকল যন্ত্রপাতির স্মৃতিভান্ডার আর মহাকাশ মূলত বিভিন্ন দেশের স্যাটেলাইটের বিচরণশালা বা আস্তাবল। জাগতিক এইসব বিষয় বহু দিবস-রজনী-ব্যাপিয়া আমাদের আরাম প্রদান করিতেছে এক প্রকার আগুন ছোঁয়া বসন্তের বাতাসের ন্যায়। ফাইভডি গ্লাস পরে সিনেমা দেখিলে যেমন করিয়া সকল উত্তেজনার সম্মুখ অভিজ্ঞতা হইতে থাকে দর্শকের, বিষয়টা অনেকটা তাই। আনোয়ার তাহার জিনের বাতাস খাওয়া ব্যাকা মুখটার সাথে পরিচিত হওয়ার জন্যেই বুঝি একটা আয়না খোঁজে এদিক ওদিকে ব্যস্ততার সহিত। এদিকে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনাধীন আগারগাঁও তালতলা নামক এলাকায় একটা বিজ্ঞাপন মিসিং হইয়া গিয়াছে দেখিতে পায় আনোয়ার। উহাতে লেখা ছিলো:

এখানে জিন পরির মাধ্যমে
সকল সমস্যার সমাধান করা হয়
আব্দুর মুন্নাফ, মোবাইল: ০১৬২৩-৬১২৬৫৩

গতকালকেও বিজ্ঞাপনটা আনোয়ারের চোখে পড়িয়াছিল। কিন্তু অদ্য ১২ মার্চের দুপুরটা তাহাকে এমন হতচকিত করিয়া ফেলিয়াছে যে, সে উপরের বিজ্ঞাপনের বদলে সকল জায়গায় নতুন কিছু ব্যানার ও পোস্টার দেখিতে পায়।  

‘পানির মোটর ডিজিটাল করি।
ছাদের ট্যাংকি ভরিয়া গেলে আর কোনো টেনশন নাই’

আনোয়ার বিমর্ষ হইয়া পড়ে এই দুর্যোগে। তাহার প্রয়োজনের সময় জিন-পরির খোঁজ দরকার। এক্ষণে ডিজিটাল পানির মোটর তার কাছে নিতান্তই অপ্রয়োজনীয়। অত্যধিক পরিচিত গলিতে নতুন এই অভিজ্ঞতা তাকে বিমর্ষ করিয়া তুলে। মুহূর্তেই তার মাতৃ-স্মৃতি ফেরত আসে। অঝোরে কান্না পাইতে থাকে। মনে পড়ে আনোয়ারের, মা বলিয়াছিলো যে,      

পুত্রেরা দারুণ বিশ্বাসঘাতক, পালিয়েছে ঘর ছেঁড়ে;
কন্যারা গাঢ় তরমুজের দানা, প্রবল খনির শ্রমিক

সে-মুহূর্তে তালতলা কলোনীর যে রাস্তাটা পানির ট্যাংকির দিকে চলিয়া গিয়াছে, উহা ধরিয়া সাঁই সাঁই করিয়া, ছুটিয়া যওয়া অবস্থায় রুবীকে দেখা যায়। একই রকম প্রায়-মুখস্থ ব্যস্ত-সমস্ত ভঙ্গি, শাড়িতে আবৃত দেহের রুবী, ভেসপা থামাইয়া, এক খাবলায় আনোয়ারকে তাহার পিছনে বাঁধিয়া লইয়া ছুটা শুরু করে। কোথায় যাইবে কদ্দুর যাইবে, তাহা অজানা ভীষণ। কেনইবা রুবী তাহাকে এরূপে হরণ করিয়া ছুটিতেছে তাহাও অনুমেয় নয়। প্রকাণ্ড দুপুরে ঢাকা শহরের বুকে এমন ঘটিতে থাকে। আনোয়ার নিঃশব্দে নিখোঁজ হইয়া যাইতে থাকে যেন।    

ওয়েদার স্টেশনের মনিটরের সম্মুখে বসিয়া থাকিলে রৌদ্র, মেঘ, উষ্ণতা, উইন্ডস্পিড সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান লাভ করা যায়। অদ্য ১৫ মার্চ—তাপমাত্রা অদ্যাবধি সহনীয় ও মনোরম থাকবারই কথা। কড়া গুনিলে দেখা যাইবে চৈত্রের মাঝামাঝি সময়টা।


‘চুদমারানীর পোলারে গ্যারেজের চিপায়
লয়া শুয়ায়া দে। গুল্লি বেশি খরচ করন যাইব না।
মাত্র ১পিস।
গল্লির বাতাসেও যেন টের না পায়।

প্রথমে গ্যারেজে ঢুকাবি, মাটিত ফালায়া বুকে পাড়া দিবি।
তারপর ১পিস গুলি। জানটা যে গেল, ওই মাদারচুদে নিজেই
যেন টের না পায়।’


তালতলার কাছেই কোনো চিপায় চাপায় বইসা এইগুলা বলে রাজুভাই। রাজুভাই দম নিতে গিয়া হাপায়। করোনা তার জান কবজ না করলেও, এমন গুয়া মাইরা থুয়া গেছে যে, তাগড়া লোকটা শেষ একেবারে। কার উদ্দেশ্যে রাজু ভাই এইগুলা বলে, তা জানা যায় না। বুঝাও যায় না। কিন্তু বুঝি যে, হাওয়া খুব গরম মহল্লায়। তখন আমি মনে মনে পড়ি..

এমন ধানক্ষেত, তৃণভূমি, আঙুরের বাগান, মসজিদ,
পরিখা আর সেনাছাউনি পার হয়ে ওই আলোর ঘোড়া
প্রাণ কি দিয়ে বাঁধবে বলো? কোন ওষুধ তোমার ডানার
শুশ্রূষার পরে পুনরায় জেগে ওঠে? কেন তোমার ইউএফও
মাঝরাত্রে, একা কাঁদে
পাহাড়ের পর বনবনানী, শহর, নীলাকাশ, রেললাইন
প্রাসঙ্গিক হয়। একটা বন্দর ওই বর্ণনায় প্রাসঙ্গিক হয়
সারারাত খোলা থাকা ভিডিওগেইমের দোকানের সামনে
আমি হা করে দাঁড়িয়ে থেকে গ্রীষ্মকাল পার করে দিই
এরপর রমণীরা আসে। তারা প্রাচীন। বিপুলা।
এনিগমাপ্রিয়। তারা কৌতুক বলে, শরীর দুলায় আর
পায়রাদের খাবার দেয়ার জন্য ছেঁড়ে দেয় পোষা সব
বলবান পুরুষ
এইভাবে হ্যাঙ-আউটের পর এক অতিকায় তাঁবু ভেসে
ওঠে, নীল বায়ু বয়। বসন্তদিন আসে। যায়। ছেলেরা
মেয়েদের কানে শিমুলের তুলো গুঁজে দেয়। গান করে।
বলে, ‘ছবিতে ধরে রাখো সাঁতারের দিন!’
অন্য কোনো গ্রহের ছবি আঁকা সাবান ফ্যাক্টরির দেয়ালে।
সাপের ট্যাটু, ঘোড়ার পিঠ এইভাবে পৃথিবীতে এলো;
গমচাষীর জন্য রে মন লিখো গান
কৃষিজীবনী জেনে হাসো। বেঁচে থাকো
স্টিমার ছাড়িয়া গেলে। গ্রামে, গঞ্জে, হাটে
তোমার চৈত্রের দিন, এইরূপে লেখা

***

ইত্যবসরে ফিসফিস স্বরে রুবীর কণ্ঠ শোনা যায়।
গুনে গুনে ৫ বার রুবী বলে (আনোয়ারকে উদ্দ্যেশ্য করে),  

আনোয়ার, গ্যারেজের দিকে চলো যাই প্লিজ

তুমি কী-করে ভাবছো, আরো কিছুদিন গেল, এই ২০১৭ তে। কিছুটা নিস্ফল আর নিষ্কাম এই যাতনাবোধ, কেন বাদামবনে, তুমি নিখোঁজ হয়ে গেলে? এই যে যুদ্ধ-পরিস্থিতি জারি করে রেখেছো তা কি জানে পার্টি অফিস? প্রায়ই তোমাকে ড্রাগনফলের বাগানে দেখি। খুব বিষণ্ন। তোমার প্রেমিক হারিয়ে গেছে। তুমি তার কথা ভাবো। তোমার আত্মা কি আজ তাইলে পরিপক্ব ফলের রূপ পেলো। জানি, ক্যারম খেলার পর, সন্ত্রাস তোমার ভিতরে একাই জেগে ওঠে। যেন ভারী সমুদ্রজলের ভিতর থেকে নাক তুলছে ডুবোজাহাজ; আহা

হাঁসের পাল নদী পার হবার আগে, ঘাড় বাঁকিয়ে দেখে নিচ্ছে তার গ্রাম। গ্রাম মানে এক নিরুদ্দেশ তারার জীবনী।  

***

তাকে বলে দাও, মৃত সন্তানও একদিন তার পিতার কাছে
ফিরে যাবে একা। বলে দাও, ঘাঘড়া পরা তরুণীর দল
এই পথেই গেছে। তারা স্বাস্থ্যবতী ও মোলায়েম। তারা
তারাপুঞ্জে ধাঁধার কথা লিখে দিতে পারে একা।

***

তাকে বলো—রক্ত-সম্পর্ক বলতে কোনো কিছু নাই এ পৃথিবীতে।

আর আত্মীয়তা আসলে দূর কোনো গ্রহ থেকে  
ছিটকে   আসা উল্কা বিশেষ, যার জন্ম আছে কিন্তু গন্তব্য অনির্ধারিত ও অনিশ্চিত।

***

তাকে বলো—আবহাওয়া নিয়তি-নির্ধারিত। তুমি কেবল
তার গতি প্রকৃতি জেনে নিতে পারো; বলতে পারো
তাপমাত্রা আজ ২০ ডিগ্রি নেমে আসবে। বলতে পারো
উইন্ডস্পিড সর্বোচ্চ ১২০ কিলো প্রতি ঘন্টায়;

আর আবহাওয়া সম্পর্কিত যে কোনো জ্ঞান— তোমার
আভিজাত্যের প্রকাশ—সেটাও বলে দিতে পারো।

***

আজ শীত শেষে, এই ১১ ই মার্চ, হঠাৎ কেমন বৃষ্টি এলো
কাঁপিয়ে, হুহু করে তোমার দীর্ঘশ্বাস ছোটে, চট্টগ্রামের হাইওয়ে থেকে!

আনারফলের বীজ, বিমাতার কাছে তুমি এমন
করুণ-স্বরে কেন কাঁদছো ভাই; কোনো সান্ত্বনা নেই
শুশ্রূষাও নেই। হাহাকার শুধু উপকূল জুড়ে। এইসব মনে পড়ে।

***

যেনবা কোনো হারমোনিয়াম, একাই বাজছে। দিনভর। বিষাদসুরে। পলায়ন নেই। মনে হতে পারে, একটা অর্জুন গাছ। মহাসড়কের পাশ ঘেঁষে অপেক্ষায় আছে। তার নাকের কাছেই রেললাইন। টয়ট্রেন আসে। ঘুরে যায়। হাসে। মনে হতে থাকে, আর কদিন যাক, তারপরেই সুস্বাস্থ্যের দিন।

***

রুবী: (কিছুটা হেঁয়ালি করেই আনোয়ারের উদ্দেশ্যে সে বলতে থাকে)  

‘মেয়েদের কাছে যাবার আগে জিম থেকে ঘুরে এসো’
‘পৃথিবীতে একটাই নিষ্পাপ শব্দ, নির্ভার ঘুম’
‘রেডিও তোমার সংকেত বোঝে, আর শরীর জানে, ডালিম ফোটার ভাষা’
‘দূরবীন নয়, ওই ডিশএন্টেনা তোমার পিতা, নতজানু হও’

আনোয়ার: (নিশ্চুপ থাকে সে ‍রুবীর কথা শুনেও। নিরুদ্বিগ্ন। মিন মিন করে বলে)

‘ভালো ডিটেক্টিভ নই বলে তোমাকে পাবো না কোনোদিন’

***

রুবী: (আনোয়ারের এইসব কথায় বিরক্ত রুবী। চিল্লায়। মনে হয়, অগণন শিমুলতুলো ফেটে-ফুটে চৌচির)  

সেলাইকল থেকে ময়ূরের ডানা ছুটে আসছে;
আনোয়ার, তুমি যাও; ওই যে গোপন ছক, তার ভিতর
প্ররোচনা আছে। পিস্তল হাতে, বেহুদা  
ট্যাক্সি-ক্যাবে ঢুকে দেখেছি, সুপুরুষ ঘোড়ার
জন্য কাঁদছে রমণীরা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে। তোমার কাছে
পৌঁছাবার আগে যে সূর্যমুখী ফোটে, তার রহস্যভেদ করতে পারিনি
এতই ক্রুর ও বুনো নভোমণ্ডল, জটিল তার ভাষা,
মদ আর প্রেম।

আনোয়ার: (১৮ মার্চ অদ্য। তীব্র রোদ। ঢাকা শহর ছাড়িয়ে সবখানে তুমুল ট্র্যাফিক। তিন দিনের ছুটিতে বাড়ির দিকে ছুটছে মানুষ। বিড়বিড় করে নিজে নিজেই আওড়ায় আনোয়ার:)

‘কয়টা ট্যাটুর মালিকানা তোমার’ বলে তাকাতেই
রুবী রহস্য করে। চকিত উটপাখি যেন, পুরুষকে উস্কে দিচ্ছে;
সবকটা সিগ্রেটের প্যাকেট, চিপস ও চানাচুর শেষ করে দিওনা
রাত এখনো বাকি! পাহাড়, পরিখা আর এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে
পাড়ি দিয়ে, ভাঙ্গা হেডলাইটসহ, এই জিপ কি রেস্টহাউজে
পৌঁছাবে ঠিক মতো, এই গাঢ় প্রশ্ন থেকে যায় যদিও;
ততক্ষণে রেডিও ছেঁড়ে দিয়েছো, রবীন্দ্র-সঙ্গীতে
সঁপে দিচ্ছো দেহ তুমি, এই হেমন্তে এমন উচ্ছৃঙ্খল সবকিছু;
তারপেরও ট্যাটুর কথাটা গোপন থাকে না। আমি দূরবীনে চোখ রাখি
তোমার সলাজ হাসি, বিপজ্জনক মাত্রা ছাড়িয়ে যেতে থাকে;

***

রুবী:

অবসাদ থেকে মুক্তি পাওয়া যুবকদের কিউ বেড়ে চলেছে
কনসার্টে। এরা বিপজ্জনক। তুমিও তাই আনোয়ার।  

হেমন্তে রচিত গানে এইভাবে প্রবঞ্চনা ঢুকে পড়ে

আনোয়ার: (এবার ডুকড়ে কেঁদে ওঠে সে। তার বুক ভেঙ্গে কান্না আসে। রুবীর উদ্দেশ্যে বলতে থাকে)  

‘বসন্তের দিবসের শেষেও তোমার কাছে পৌঁছাতে পারি না।
তোমার কাছে পৌঁছাতে টিকিট লাগে
এক জনপদ থেকে রাস্তা আরেক জনপদে পৌঁছায়
তোমার প্রশংসা চন্দ্র থেকে আসমান আর উজ্জ্বলতর নক্ষত্রের দিকে ধায়।
কিন্তু ইউএফএতে চড়েও তোমার কাছ পর্যন্ত যেতে পারি না আমি
যেন তোমার কাছে পৌঁছাতে অনেক দামী কোনো টিকিট লাগবে’

রুবী:

ওয়েদার ফোরকাস্ট দেখে বাইরে যেও
পোষা কচ্ছপছানাকে গুডবাই বলে এসো। আমার নো’জ পিনটা
রহস্য করতে পারে, সন্ধ্যায়, সাবধানে থেকো। নিউমার্কেটে তরুণী
বিক্রেতার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসো না, নিতে পারবে না সে এই এনিগমা।

***

আনোয়ার:

মনে আছে, ওই যে, সারাটাদিন লবণের ব্যবসা করে, ব্যাপক
লাভ করেছি দুজন। তুমি তো বোকা, লবণের ঢিবিতেই
পারলে ডুবে যাও।

রুবী:

আগামী শনিবার সেইফ জোন,
এসো, হীরের আংটিতে লেখা খুন দেখাবো তোমাকে!

আনোয়ার:

অ্যালুমিনিয়াম ফয়েলে, মুড়িয়ে রেখেছো ডানা;
কম্পাস ও জিপিএস মেশিনের ক্ষমতার বাইরে
সূক্ষ্ম কোনো কামিনীফূলের ঘ্রাণের মত—অতর্কিত
ও অশরীরী, শুধু সংবেদনে জেগে আছো;  
একটা পিঁপড়ে একা শুধু তোমার পথ খুঁজছে
তাকে করুণা করো (আল্লাহ)

Jean-Michel Basquiat, Skull, 1981

কাঁধের ট্যাটু পোষ মানেনি বলে
প্রত্যাখাত হয়েছি আজ। তুমি
রেস্তোরাঁয় গিয়েছো মরে, জানি;
পিস্তলের কাঁধে রেখেছো প্রাণ
অজানা নয়। তবু তোমার ভাষা
বহুব্রীহি সমাসের চেয়েও জটিল আর
প্রবঞ্চক আজ; বুঝি হাসিও
অজানা রয়ে গেল আজও হায়
মিউট হাওয়াকলের মতন
তোমার কাছে পৌঁছানো গেলে মেবি
সোনায় বাঁধানো দন্তরোগ অর্থময় হতো।

পিস্তল তাক করিয়াছিলো রাজু ভাই ঢাকার কোনো এক চিপাগলির ভিতর থাইকা। গলিটার আকৃতি আসলে নূহ নবী যেইরূপ মাছের পেটে গুপ্ত রহিয়া ছিলেন, তাহার মতন। শালার জার্মান পিস্তল, তাক করা পর্যন্তই। মিস ফায়ার হইয়া বেহুদা তুমুল রক্তারক্তি আর এই চামে মুখ ব্যাকা আনোয়ারে, ভেসপা-ওয়ালী রুবীরে লয়া মারছে চম্পট। যদিও রুবীই আনোয়াররে ভাগায়া নিছে সবাই বলাবলি করে। তখনো শীতের আমেজ কাটে নাই।

***

পার্টি অফিসে ভিড় নাই। শাটার নামানো দোকানপাটের ভিতর বসন্তকালীন হাসির আমেজ। সকাল সকাল এমনটা ঘটে, সৌরশক্তি চালিত জীবাণুগুলো বেদম ঘুরে বেড়ায়। থ্রিডি গ্লাস চোখে তুলে আসমানের দিকে ছুটে যায় অসুখী আত্মার খেলনা গাড়ি, নকল দাঁত, দন্তরোগ। আর রুবী পায় আনোয়ারকে, রাজু ভাই পায় মিসফায়ারে সিদ্ধহস্ত এক বিষণ্ন পিস্তল। তবে রাজু ভাই পায় না রুবীকে। রুবীর ভেসপা সৌরশক্তিচালিত হেমন্ত উদ্যানের দিকে ছুটিয়া যায় বলেই জানি।

এদিকে মহল্লার মাস্তান রাজু ভাই, রুবীর সম্পর্কে যে জ্ঞান লাভ করে, তাহার ভাষান্তর এমন—

‘মেয়েরা নৃত্যপটু। তারা সন্তানবতীও। তারা জানে
জল ও আগুনের মধ্যবর্তী এক শক্তির উৎস তাদের স্তন।

শোনো মেয়েরা আমাদের লালন করে, সন্তানস্নেহে;
বোরো ধানের খামারে’

***

রুবীর ভেসপার ভটভট শব্দে,
রাজু ভাই’র অস্ফূট উচ্চারণ থেমে যায়। একই সময়ে  
দিগন্তের শেষ চূড়ায়, রমণীরা লোকগীতি পরিবশেন করে শত শত কচ্ছপের পিঠের ওপর দাঁড়িয়ে।  
তাদের রক্তাক্ত পায়ে সুপুরুষ যুবকেরা মুখ রাখছে,  
শুষে নিচ্ছে অপার বেদনাভার। আর মনে হতে থাকে,  
সহস্র বছর ধরে, তারা শুধু প্রেমের দিকে চেয়ে আছে, এমন ভূতুড়ে সবকিছু এমন অবিশ্বস্ত আর রহস্যময়

***

ফ্রিজবি মূলত গোলাকার। সৌরজগতের মতোন  
অবিশ্বস্ত সম্পর্কের ভিতর ঘুমিয়ে থাকে।  

যখন হাওয়া বয়, সবাই সবার নাম ভুলে যায়।  
একক সেলাই কল ঘুরে ঘুরে জরির সাথে সঙ্গম করে  
তখন নক্ষত্র পতনের শুরু। তখন আত্মা থেকে ভুসভুস করে মহাজাগতিক নানান রশ্মি বের হয়।
কারো নাম নক্ষত্র কারো নাম গ্রহ কারো নাম সুবাস কারো নাম প্রাণ কারো নাম বোরোধান কারো নাম পক্ষী কারো-বা জব্বার।  

রশ্মিরা বলশালী।
তাদের বিখ্যাত স্মৃতিভাণ্ডার তারা সহস্র হেক্টরের গমক্ষেতের মতো সুন্দর,
হেমন্তের ধানের মতো নান্দনিক আর কাঠামোগত ভাবে কয়েকটা সৌরজগতের মতো বিপুলা।  

তাদের আকার আকৃতি ধাঁধাগ্রস্থ করে। আমরা ভাবি  
এরা রমণীতুল্য, আল্লাহর সৃষ্টি এক অপরূপ বিন্যাস।  
অসীম তাদের বিস্তৃতি, পারমুটেশন কম্বিনেশন।  

আমরা তখন ভাণ্ডাররক্ষক নামে  
একটা পদ তৈয়ার করি, তাকে খাতা ও কলমে  
সকল ঘঠনাবলি লিপিবদ্ধ করার কর্ম পদ্ধতি প্রদান করা হয়।  

অতঃপর সে একজন লেখক বা দলিল লেখক অথবা কবি হইয়া উঠতে থাকে।
যদিও জেনেছি এক সুন্দর বসন্তের ভোরে,  
যখন ফজরের আযানে জিন জাতি ও ইনসানেরা প্রার্থনায় নত হয়,
সে মুহূর্তে এই ভাণ্ডাররক্ষক বিবিধ ঘটনার চাপে মস্তিষ্কের স্থিতি হারাবে।
মস্তিষ্ক যেহেতু থ্রিডি স্ক্যানারের প্রতিলিপি  
সে কারণে যে কোনো মানুষের স্থিতি হারানোটাই প্রাকৃতিক। এটা আমরা এতদিনে মেনে নিতে শিখেছি।

***

স্বনির্ভর রমণীদের হাসি আমরা লিখে রাখি।
তারা সুকেশী, দন্তরোগ বিশারদ, তুমুল যৌনতায় পারঙ্গম।

যমুনা নদীর মত পলিনির্ভরতা আমাদের  
পিতৃতুল্য করে তোলে। আর আধুনিক  
পশুপালনের রীতি-নীতি ও সেচপদ্ধতি
বাংলাদেশের মানুষজনকে ক্রমে জটিল ও গাণিতিক করে তুলেছে জানি।

যদিও তখন আমাদের নদীমাতৃক প্রাণ হৈ হৈ রৈ রৈ করে।

***

সক্ষমতা পাশবিক জেনে কিছু গান লেখা হলো।

রমণীরা উর্বর হলে যেমতি দেশ ও ভূমি বিখ্যাত হয়ে ওঠে সমরবিদ্যায়।
সন্তানের বক্ষভেদ করে যে তাবিজগুলো রোপণ করা হয়েছে তা সাহসী ও বুদ্ধিমানদের জন্যে মূলত।  

মানুষ নিজের সারল্যে কখনো আস্থাবান থাকে না।  
সে চায় বুদ্ধিমান যন্ত্রের হৃদয় আর সবল বোকাদের আনুগত্য।

(এখানে স্মর্তব্য যে,
রুবীর সাথে রাজু ভাইয়ের সম্পর্কের বদলে
মুখ ব্যাকা আনোয়ারের সম্পর্কের বীজও কিন্তু পারদর্শীতা শব্দের ভিতরে লুক্কায়িত।)


রুবীর জন্যে এলিজি

আসিয়াছে সুস্বাস্থ্যের দিন বসন্তের ভোরে আহা
চর্বি কাটা মৃদু নদী ঘেঁষে রাগী ত্বকের গভীরে
তাহাকে প্রহার করো যেন প্রেমিকের নীল দেহ
চড়িয়াছে অজানার যানে শব্দ তুলে ভোঁ ভোঁ করে।

ইহা পিকনিক রোগ অভিশাপ দামী হাসপাতাল
জীবাণুর দিনে ঠাণ্ডা মেরে আসা দেশ-প্রাণ-রাস্তা
দিলে শুধু চাক্কু ঢুকে ছিটকে আসে রক্ত-বীর্য-ঘাম
গ্রহ ঘুরে উপগ্রহ জুড়ে আজাদির ঘাসে, প্রান্তরে।

আসিয়াছে সুস্বাস্থ্যের দিন কিছু কথা তবু বলো
স্তনের আকারে যদি কিছু লাল হীরা মেলে মৃত
‘ভালোবাসি বলে’ ধূর্ত ডাকু বাঁধো চোখ নগ্ন করো
গ্যারেজে বসিয়া গড়ো সুইসাইডাল ট্র্যাক নিঃসঙ্গের।

আসিয়াছে সুস্বাস্থ্যের দিন বসন্তের ভোরে আহা
চর্বি কাটা মৃদু নদী ঘেঁষে রাগী ত্বকের গভীরে
তাহাকে প্রহার করো যেন প্রেমিকের নীল দেহ
চড়িয়াছে অজানার যানে শব্দ তুলে ভোঁ ভোঁ করে।


রাজু ভাইয়ের বাসনা তাড়িত যান

সৌরশক্তিচালিত হে প্রেম কতদূর যাবে তুমি
দেহ ফেলে ষষ্ঠ আসমানের কাছাকাছি কোনো খানে
নিঃসঙ্গ বিধুর সুরমা রঙে উচ্চকিত অভিনয়ে
তোমার ডানার গন্ধে দামী দামী ধাতু আর মায়া।

মৃদু মানুষেরা গুম হবে বসন্তের আর্ত পেটে
বিশ্বস্ত গমক্ষেতে তুমি যখন উপুড় হয়ে পরবে
তোমার পিঠের ট্যাটু বাস্তবিক সব ডানা পাবে
আর দূর কোনো সন্ধ্যাতারা কাঁদতে বসবে সঙ্গোপনে।

তার ভালোবাসা ছিল সুঠাম স্তনের মতো একা
তার দেহ ছিল তীব্র অতর্কিত উত্তুঙ্গ সঙ্গমে
অজানা দূরবীনে যত অভিশাপ লেখা হলো, ক্রমে
দূর-নিয়ন্ত্রিত তুমি লাজুক রমণী এসো, জাগো।

অস্ফুট স্বরের মতো কিছু পুষ্প চির আততায়ী
যেনবা ফ্রাগ্রেন্স মিছে ঊরু থেকে জঙ্ঘা থেকে আহা
বাসনা তাড়িত যান এভাবে জেগেছে চিরকাল
অচেনা শত্রুর মতো অকস্মাৎ তীব্র জ্বরে ভুগে।

 


আনোয়ারের সাফল্য সূত্র  

প্রক্ষেপণের সূত্রেরা কমিক জেনেছি দুনিয়াতে
হেমন্ত না-দেখা স্মৃতি ঝরে পড়ো ভূমিজুড়ে আজ
সুফলা স্তনের কাছে হাঁটু গেড়ে বসো দৃঢ় যুবা
অবসাদ নেই, চাষে পারদর্শী হও, বাঁধো বুক। 

শ্যামল রমণী তার ঊরু খুলে দিলো স্নেহে, গানে
প্রশ্নাতীত অমরত্ব এলো বসন্তের দিন ভুলে
ফেরেশতা উড়েছে: গেছে জিন ও ইনসান অজানায় 
প্রশস্তির বক্ষ খোলো সুফলার দেশে পুরুষেরা।  

আসমানের চেয়ে ব্যাপ্ত অধিক কিছুই নেই আর
তোমাকে রচেছে তৃপ্ত রমণীরা বলেছি বারবার
ধানে গমে শস্যে জানি কিছু ভুল গোলাগুলি হলো 
কুড়াও নক্ষত্র মহাশক্তি জ্যান্ত ফলের দরবার।  


বিজয় আহমেদ – কবি। জন্মসূত্রে মমিসিঙ্গা, বর্তমান নিবাস মার্কিন মুলুকের আরকানসায়। কাব্যগ্রন্থ সার্কাস তাঁবুর গান, কমিকস, ক্যামেরা, ট্র্যাভেলগ ইত্যাদি, আমি ইয়াসিন আমি বোরোধান এবং কয়েক খণ্ডে সম্পাদিত সিনে-পুস্তক ফিল্মমেকারের ভাষা-সহ মোট প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ৮, যুক্ত ছিলেন ওয়েবম্যাগ লাল জীপের ডায়েরীর সম্পাদনায়।

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান